Home খেলাধুলা ফুটবল উৎসবে মাতোয়ারা কুড়িগ্রামের গ্রামগঞ্জ

ফুটবল উৎসবে মাতোয়ারা কুড়িগ্রামের গ্রামগঞ্জ

ছবি: এ আই
নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: মেক্সিকো, কানাডা এবং আমেরিকার সবুজ গালিচায় যখন গড়াবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের বল, তখন তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে হিমালয়ের পাদদেশের জেলা কুড়িগ্রামে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা আর তিস্তা বিধৌত এই অঞ্চলের গ্রাম থেকে গঞ্জে এখন শুধুই ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা। বিশ্ব ফুটবলের মেগা আসরকে কেন্দ্র করে উত্তরের এই সীমান্তবর্তী জনপদে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
শহরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে শুরু করে উলিপুর, চিলমারী, নাগেশ্বরী কিংবা ফুলবাড়ীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চল—সবখানেই এখন পতপত করে উড়ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাট-বাজারের আড্ডা, সর্বত্রই আলোচনার মূল খোরাক এখন ফুটবল।
পতাকা আর জার্সির ধুম
কুড়িগ্রাম শহরের জাহাজ ঘর মোড়, জিয়া বাজার কিংবা মোগলবাসা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত বাজারে ঘুরে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। বাঁশের মাথায় প্রিয় দলের বিশাল বিশাল পতাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে স্থানীয় তরুণেরা। দর্জি পাড়াগুলোতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই, দিন-রাত চলছে প্রিয় দলের জার্সি আর পতাকা তৈরির কাজ।
বাজারে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল কিংবা জার্মানির জার্সির চাহিদা তুঙ্গে। তবে এবার বৈশ্বিক ফুটবলের পরিধি বাড়ায় এবং নতুন নতুন দল অংশ নেওয়ায় তরুণদের মাঝে ফুটবল নিয়ে আগ্রহের মাত্রা অন্যান্যবারের চেয়ে অনেক বেশি।
চায়ের কাপে ঝড় ও বড় পর্দার প্রস্তুতি
কুড়িগ্রামের গ্রামীণ জনপদের প্রাণকেন্দ্র হলো এখানকার সান্ধ্যকালীন হাট-বাজারের চায়ের দোকানগুলো। সন্ধ্যার পর ধরলা ব্রিজের পাড় কিংবা প্রত্যন্ত চরের ছোট বাজারে চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন ফুটবলপ্রেমীরা। আলোচনা-তর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আধুনিক ফুটবলের ব্যাটন বদলের লড়াই। লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের এটাই শেষ বিশ্বকাপ কি না, কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হাল্যান্ডের মতো নতুন রাজপুত্ররা এবার বিশ্ব শাসন করবে কি না—তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
খেলা দেখার জন্য গ্রামের তরুণ ও যুবসমাজ নিজেদের উদ্যোগে বাজারের মোড়ে মোড়ে প্রজেক্টর ও বড় পর্দার (এলইডি টিভি) ব্যবস্থা করছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা মাথায় রেখে বিকল্প হিসেবে জেনারেটরের আগাম বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছে, যেন ১০৪টি ম্যাচের একটি মুহূর্তও মিস না হয়।
চরাঞ্চলেও ছড়াচ্ছে ফুটবলের আলো
কুড়িগ্রামের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতেও বিশ্বকাপের ঢেউ লেগেছে। রৌমারী বা রাজিবপুরের অনেক চরে যেখানে এখনো গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ (সোলার প্যানেল) চালিত টেলিভিশনকে কেন্দ্র করে জড়ো হচ্ছেন শত শত মানুষ। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের মানুষ বন্যা আর নদীভাঙনের ক্লান্তি ভুলে সাময়িকভাবে মেতে উঠেছেন ফুটবলীয় আনন্দে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে মঙ্গা বা অভাবের যে চিরাচরিত রূপ আগে দেখা যেত, তা এখন অনেকটাই কেটে গেছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ায় বিনোদনের এই বৈশ্বিক উৎসবকে এখন সানন্দে গ্রহণ করছে কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষ।
সব মিলিয়ে, ভৌগোলিক দূরত্ব বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কোনো কিছুই আটকাতে পারছে না কুড়িগ্রামের ফুটবল উন্মাদনাকে। মাঠের লড়াই মার্কিন মুলুকে হলেও, তার হৃদস্পন্দন আর উল্লাস ধ্বনি এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কুড়িগ্রামের আনাচে-কানাচে।
Visit www.businesstoday24.com