Home আন্তর্জাতিক ছায়া নির্বাচন ও ‘পাপেট’ সরকার: মিয়ানমারে মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

ছায়া নির্বাচন ও ‘পাপেট’ সরকার: মিয়ানমারে মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

মিন অং হ্লাইং
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মিয়ানমারে বর্তমানে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে ব্যালট পেপারে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের নাম নেই। রাস্তার ধারের রঙিন পোস্টারেও তার ছবি অনুপস্থিত। তবুও দেশটির প্রতিটি ভোটকেন্দ্র এবং রাজনৈতিক অলিগলিতে একটি নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে—জেনারেল মিন অং হ্লাইং।
২০২১ সালে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসা এই জেনারেল এখন এক নতুন ‘রাজনৈতিক চাল’ চালছেন। তিন ধাপের এই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে দেখাতে চান যে, তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করছেন। কিন্তু পর্দার আড়ালের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
১. ‘অভিজাত ব্যবস্থাপনা’ ও ক্ষমতার ভারসাম্য
বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে দেখছেন জেনারেল হ্লাইংয়ের একটি ‘এলিট ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ বা অভিজাত শ্রেণি সামলানোর কৌশল হিসেবে। গত কয়েক বছরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে একের পর এক এলাকা হারিয়ে সামরিক বাহিনীর ভেতরে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করতেই এই ক্ষমতা ভাগাভাগির নাটক।
ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি – মিয়ানমারের সহযোগী নাইং মিন খান্টের মতে, “এটি মূলত দায়ভার ভাগ করে নেওয়ার একটি কৌশল। হ্লাইং ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখেও ব্যর্থতার দায় অন্যদের কাঁধে চাপাতে চান।”
২. অনুগতদের পুনর্বাসন ও শক্তিবৃদ্ধি
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জেনারেল হ্লাইং দুটি পথ বেছে নিয়েছেন: পুরস্কার ও শাস্তি।
পুরস্কার: বিশ্বস্ত সামরিক কর্মকর্তাদের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বানিয়েছেন।
শাস্তি: সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী বা সমালোচক কর্মকর্তাদের কোর্ট মার্শাল বা বন্দি করেছেন।
একইসাথে, চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তির কূটনৈতিক সমর্থন তাকে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করছে। বিশেষ করে চীনের প্রচ্ছন্ন সমর্থন তাকে গৃহযুদ্ধের ফ্রন্টলাইনগুলোতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরতে সাহায্য করেছে।
৩. সু চি ফ্যাক্টর ও ‘রেড লাইন’
৮০ বছর বয়সী নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমসহ অনেক বিশ্বনেতা তার মুক্তির চেষ্টা করলেও মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে এটি একটি ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমা। সু চি-কে ক্ষমতার বাইরে রাখাই এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, কারণ তার দল এনএলডি-কে (NLD) আগেই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
৪. পর্দার আড়ালের রাষ্ট্রপতি?
নির্বাচনে জান্তা-সমর্থিত ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ (USDP) এগিয়ে রয়েছে। জেনারেল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে একটি ‘পূর্ণ রাজনৈতিক’ ভূমিকায় আসতে পারেন। মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব না রাখলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান কেন্দ্র।
হ্লাইং সম্ভবত সেই পদটিই অলঙ্কৃত করতে যাচ্ছেন, যা তাকে বেসামরিক লেবাসে একজন স্বৈরশাসক হিসেবে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।
মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের জন্য এই নির্বাচন কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। গৃহযুদ্ধে ইতোমধ্যে ১৬,৬০০-র বেশি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
জান্তা প্রধানের এই রাজনৈতিক মেকওভার বা ছদ্মবেশ শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারে শান্তি ফেরাবে, নাকি সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু করবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।