বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, মিরসরাই ( চট্টগ্রাম) : দেশের বৃহত্তম শিল্পনগরী গড়ে ওঠার পাশাপাশি মিরসরাই এখন রূপান্তর হচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান আধুনিক মৎস্য ও কৃষি হাবে। উপজেলার ইছাখালী এবং মুহুরী প্রজেক্ট সংলগ্ন উপকূলীয় চরাঞ্চলে সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ পেরিয়ে শুরু হয়েছে শতভাগ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর সমন্বিত চাষ। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি করপোরেট গ্রুপ এই অঞ্চলে হাজার কোটি টাকার মেগা বিনিয়োগ করায় পাল্টে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতির দৃশ্যপট।
একসময় মিরসরাইয়ের যে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় চরাঞ্চল অনাবাদী পড়ে থাকত, সেখানে এখন উন্নত প্রযুক্তির মৎস্য হ্যাচারি ও ডেইরি ফার্ম গড়ে উঠেছে। দেশের নামকরা শিল্প গ্রুপগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। এদের মধ্যে সিপি বাংলাদেশ, এসিআই এগ্রো, প্যারাগন গ্রুপ, কাজী ফার্মস এবং এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইছাখালী ও মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় শত শত একর জমি লিজ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। উন্নত জাতের মাছের পোনা উৎপাদন, ক্যাটল ব্রিডিং (উন্নত জাতের গরু প্রজনন) এবং স্বয়ংক্রিয় মিল্কিং প্ল্যান্ট স্থাপনে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ: প্রযুক্তি যখন চালিকাশক্তি
মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় এখন আর সাধারণ পুকুরের মতো মাছ চাষ হয় না। লোনা ও মিষ্টি পানির এই মিলনস্থলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষাবাদ হচ্ছে।
বায়োফ্লক ও আরএএস : সীমিত জায়গায় ও সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সর্বোচ্চ মাছ উৎপাদনের জন্য আরএএস এবং বায়োফ্লক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পানির গুণাগুণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
অটোমেটেড ফিডার ও অ্যারোয়েটর: পুকুরে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে উন্নত মানের অ্যারোয়েটর ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই সাথে ঘড়ির সময় মিলিয়ে মাছকে সুষম খাদ্য দিতে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ফিডিং (মেশিন)।
এখানে প্রধানত থাই পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, পাবদা এবং গুলশা মাছের চাষ হচ্ছে। আধুনিক হ্যাচারিতে উৎপাদিত এই মাছগুলো রোগমুক্ত এবং দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় দেশের বাজারের একটি বড় অংশ এখন মিরসরাই থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ডেইরি ফার্মিং ও লাইভস্টক খাতে আধুনিকায়ন
ইছাখালীর চরাঞ্চলে গড়ে ওঠা ডেইরি ফার্মগুলোতে শতভাগ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবাদি পশু পালন করা হচ্ছে। হলস্টাইন-ফ্রিজিয়ানসহ উচ্চ দুগ্ধজাত জাতের গাভী আমদানির মাধ্যমে দুগ্ধ উৎপাদনের এক নতুন বিপ্লব শুরু হয়েছে।
ফার্মগুলোতে গরুর স্বাস্থ্য ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য আধুনিক শেড তৈরি করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দুধ দোহন ও তা দ্রুত চিলিং সেন্টারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকায় দুধের গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকছে। এছাড়া গো-খাদ্যের চাহিদা মেটাতে বিশাল এলাকাজুড়ে উন্নত জাতের হাইড্রোফনিক ও নেপিয়ার ঘাসের চাষ করা হচ্ছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত
স্থানীয় সূত্র ও মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, মিরসরাইয়ের মৎস্য ও কৃষি খাতে করপোরেট বিনিয়োগের ফলে হাজার হাজার স্থানীয় যুবকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে স্থানীয় সাধারণ চাষিরাও এখন সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে আধুনিক চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন। শুধু চট্টগ্রাম নয়, প্রতিদিন মিরসরাইয়ের উৎপাদিত শত শত টন মাছ ও দুগ্ধজাত পণ্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে কৃষি-ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প আরও বিকশিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।