Home Second Lead গভীর রাতে শব্দ সন্ত্রাসে জনজীবন অতিষ্ঠ: আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?

গভীর রাতে শব্দ সন্ত্রাসে জনজীবন অতিষ্ঠ: আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?

ছবি: এ আই

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে এখন গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে গান-বাজনা এবং মাইকের ব্যবহার মহামারি আকার ধারণ করেছে। গায়ে হলুদ, জন্মদিন কিংবা ধর্মীয় মাহফিলের নামে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাউন্ড সিস্টেম ও হর্ন ব্যবহার করে জনস্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি করা হচ্ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও শিশুদের জন্য এই শব্দদূষণ এখন ‘শব্দ-সন্ত্রাসে’ পরিণত হয়েছে।

বিদ্যমান আইন ও শাস্তির বিধান

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীনে ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬’ অনুযায়ী শব্দদূষণ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:

সময়সীমা: আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত উচ্চশব্দ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

অনুমতি: বিশেষ প্রয়োজনে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্র ব্যবহারের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত পূর্বানুমতি নিতে হয়, যা ৫ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না এবং রাত ১০টার মধ্যে শেষ করতে হবে।

শাস্তি: বিধিমালার ১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রথমবার আইন অমান্য করলে ১ মাস কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে ৬ মাস কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘক্ষণ উচ্চশব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শরীরে স্থায়ী ও অস্থায়ী নানা ক্ষতি হয়:

মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা: ঘুমের ব্যাঘাত থেকে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং তীব্র মাথাব্যথা দেখা দেয়।

শ্রবণশক্তি হ্রাস: ১-২ ঘণ্টার বেশি উচ্চশব্দে থাকলে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বৃদ্ধ ও রোগীদের ঝুঁকি: হার্টের রোগীদের জন্য হঠাৎ তীব্র শব্দ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মাহফিল বা অনুষ্ঠানের মাইক গভীর রাত পর্যন্ত চলায় অসুস্থ ব্যক্তিরা বিশ্রামহীন অবস্থায় আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েন।

শব্দদূষণে ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ

পাহাড়িকা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও ষাটোর্ধ্ব হার্টের রোগী মো. আব্দুল মালেক বলেন: “রাতে যখন উচ্চশব্দে গান বা মাহফিল শুরু হয়, তখন মনে হয় বুকটা ফেটে যাবে। হার্টের সমস্যা থাকায় হঠাৎ উচ্চশব্দে আমার ধড়ফড়ানি বেড়ে যায়। সারারাত ঘুমাতে পারি না, ফলে পরের দিন পুরো শরীর অবসন্ন থাকে। প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন—আমাদের মতো অসুস্থ মানুষের কথা চিন্তা করে অন্তত রাত ১০টার পর যেন সব ধরনের মাইক বন্ধ রাখা হয়।”

বাকলিয়া এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুমি আক্তার জানান: “সামনে আমার ছেলের এসএসসি পরীক্ষা। কিন্তু পাড়ার মোড়ে প্রতিদিন কোনো না কোনো অযুহাতে রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত উচ্চশব্দে সাউন্ড বক্স বাজানো হয়। পড়ার টেবিলে মনোযোগ দেওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ কথাবার্তাও বলা যায় না। প্রতিবাদ করতে গেলে আয়োজকরা এলাকার দাপট দেখায়। আমরা এক প্রকার জিম্মি হয়ে আছি।”

 একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক বলেন: “হাসপাতালের আশেপাশে সাইলেন্স জোন হওয়ার কথা থাকলেও চট্টগ্রামে তার কোনো বালাই নেই। গভীর রাতে হঠাৎ তীব্র শব্দের কারণে রোগীরা আঁতকে ওঠে, যা তাদের রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নবজাতক শিশুদের কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। শব্দদূষণ এখন আর বিরক্তির কারণ নয়, এটি একটি নীরব ঘাতক।”

আন্দরকিল্লা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: “দিনের বেলা রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর রাতে পাড়ার মাইক—শান্তি নেওয়ার জায়গা নেই। কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে কি নেই, তা দেখার কেউ নেই। আমরা সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতেও ভয় পাই। নিয়মিত অভিযান আর জরিমানা ছাড়া এই নৈরাজ্য বন্ধ হবে না।”

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে আইন লঙ্ঘন করা হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত অভিযান চোখে পড়ে না।

পরিবেশবিদদের মতে, কেবল আইন দিয়ে নয়, জনসচেতনতা এবং প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই ‘শব্দ-সন্ত্রাস’ বন্ধ করা অসম্ভব। জনস্বার্থে এই মুহূর্তেই গভীর রাতের সব ধরনের উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী কার্যক্রমের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং আইনি প্রয়োগ জরুরি।