মাহবুব হাসান, চট্টগ্রাম: হাজার হাজার নটিক্যাল মাইল উত্তাল জলরাশি চিরে যে দৈত্যাকার জাহাজগুলো একদিন বিশ্ববাণিজ্যের চাকা সচল রেখেছিল, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে তাদের জীবনের অন্তিম ঠিকানা মেলে সীতাকুণ্ডের নরম কাদা-জলে। অতল সমুদ্রজয়ী এই দানবদের রক্তে-ঘামে গড়া বিশাল শরীর যখন অচল হয়ে পড়ে, তখন পূর্ণিমার তীব্র জোয়ারকে সঙ্গী করে পুরো গতিতে তাদের আছড়ে ফেলা হয় সীতাকুণ্ড উপকূলের কাদামাটিতে—প্রকৌশলের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বিচিং’। বালু আর কাদার বুকে একবার প্রোথিত হওয়ার পর শুরু হয় এক ধাতব দৈত্যের মৃত্যু ও পুনর্জন্মের করুণ মহাকাব্য।
অঙ্গচ্ছেদ ও জীবনের অবশেষ বণ্টন
জাহাজটি তটে স্থির হওয়ার পর প্রথমেই শুরু হয় বিষমুক্তকরণ ও প্রাথমিক খনন। ভেতরের অবশিষ্ট তেল, বিষাক্ত তরল এবং দাহ্য পদার্থ খুব সাবধানে নিষ্কাশন করা হয়। এরপর নামে শত শত শ্রমিকের হাত, শুরু হয় শরীর ব্যবচ্ছেদ। প্রথমে জাহাজের ওপরের অন্দরমহল খালি করা হয়। ক্যাপ্টেন ও ক্রুদের বিলাসবহুল সোফা, সেগুন কাঠের খাট, রেফ্রিজারেটর, সুবিশাল রান্নাঘরের স্টেইনলেস স্টিলের সরঞ্জাম, পিতলের লাইট, নেভিগেশনাল কম্পাস এমনকি ছোটখাটো তৈজসপত্রও নামিয়ে আনা হয় নিচে।
এই গৃহস্থালি ও কারিগরি সামগ্রীগুলো সরাসরি চলে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুপাশের শতাব্দীপ্রাচীন ভাটিয়ারি ও সীতাকুণ্ডের ফার্নিচার ও যন্ত্রপাতির বাজারে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ভিড় জমায় আন্তর্জাতিক মানের ফার্নেস, শক্তিশালী পাওয়ার জেনারেটর, অগ্নিনির্বাপক পাইপ, নোঙর বা বিদেশি অ্যান্টিক আসবাবপত্র জলের দামে কিনে নিতে। একটি ভাসমান শহরের যা কিছু মানুষের বেঁচে থাকার উপাদান ছিল, তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে হাজারো ঘরের গৃহকোণে।
অগ্নিশিখায় খণ্ডবিখণ্ড পেশিতন্ত্র
সব আসবাব আর সাজসজ্জা সরিয়ে নেওয়ার পর চোখে পড়ে জাহাজের মূল কঙ্কাল—বিশাল পুরু ইস্পাতের চাদর ও ফ্রেম। এবার জ্বলে ওঠে গ্যাস কাটারের আগুনের শিখা। দিনরাত অগ্নুৎপাতের মতো নীল ও সোনালি স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দক্ষ কাটারম্যানরা এক একটি বিশাল ইস্পাতের প্লেট কেটে কেটে টুকরো করেন। ভারী ক্রেন ও তারের টানে ধপাস করে কাদামাটিতে আছড়ে পড়ে এক-একটি ডেকের অংশ, যেন শতাব্দীর কোনো রণক্ষেত্রের প্রতিধ্বনি। জাহাজের মূল হৃদযন্ত্র অর্থাৎ সুবিশাল ইঞ্জিন, বিশাল পিস্টন এবং ট্রান্সমিশন শ্যাফটগুলো খুলে নেওয়া হয় আলাদাভাবে। এগুলোর অনেক উপাদান দেশের ভারী শিল্পকারখানায় পুনঃব্যবহার করা হয়, আর অকেজো ধাতব অংশ চলে যায় গলানোর লাইনে।
লোহার পুনর্জন্ম ও মহাকালের আবর্তন
জাহাজ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার রি-রোলিং গ্রেডের উচ্চমানের ইস্পাত। এই কাটা প্লেটগুলো শত শত ট্রাকে চড়ে পৌঁছে যায় চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন রি-রোলিং মিল ও অটো স্টিল কারখানায়। সেখানে হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার চুল্লিতে গলিয়ে ফেলা হয় জাহাজের সাবেক অস্তিত্ব। সেই তরল ইস্পাত রূপ নেয় চকচকে রডে, বিমে আর অ্যাঙ্গেলে। যে ইস্পাত একদিন প্রশান্ত বা আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ঢেউ ভেঙে পথ চলত, সেই ইস্পাতই নতুন রূপ নিয়ে দাঁড়ায় নতুন কোনো বহুতল ভবনের ভিত হয়ে, কোনো মেগা সেতুর গার্ডার হয়ে কিংবা কোনো ফ্লাইওভারের কংক্রিটের অভ্যন্তরে শক্তি হয়ে। সমুদ্রের বুকে যার মৃত্যু হয়েছিল, স্থলের সভ্যতায় সে বেঁচে থাকে নতুন মেরুদণ্ড হয়ে।
তিন শ্রমিকের জবানবন্দি
মো. রফিকুল ইসলাম (৪৫), সিনিয়র গ্যাস কাটারম্যান: সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডে বিশ বছর ধরে কাজ করছি ভাই। হাতে যখন গ্যাস কাটারের পাইপটা জ্বলে ওঠে, তখন চোখের সামনে হাজার টনের ইস্পাত মোমের মতো গলে যায়। বাইরে থেকে দেখতে এটা শুধুই আগুনের ফুলকি, কিন্তু ভেতরে দাঁড়িয়ে কাজ করা মানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া। জাহাজের পাইপলাইন বা ট্যাংকের ভেতরে কখন যে জমে থাকা মিথেন বা বিষাক্ত গ্যাসে আগুন ধরে ব্লাস্ট হবে, কেউ জানে না। কত সহকর্মীকে চোখের সামনে পুড়ে কয়লা হতে দেখেছি তার হিসাব নেই। তবে যখন দেখি বিশাল একটা জাহাজের শরীর কেটে নামিয়ে আনছি, তখন ভয় আর ক্লান্তি দুই-ই হারিয়ে যায় পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার তাগিদে।
সুজন চাকমা (২৮), ওয়্যার রোপ ও রিগিং শ্রমিক: আমার কাজ হলো ওপর থেকে কেটে ফেলা ভারী প্লেটগুলোতে ক্রেনের মোটা তার আর শেকল শক্ত করে বাঁধা, যাতে নিচে নামানোর সময় ছিঁড়ে না পড়ে। প্রায়ই পঞ্চাশ-ষাট ফুট উঁচুতে কোনো শক্ত সাপোর্ট ছাড়া ঝুলতে হয়। পায়ের নিচে পিচ্ছিল কাদা আর ধারালো ভাঙা লোহা, একটু অসতর্ক হলেই সোজা নিচে আছড়ে পড়তে হবে। দিনশেষে গায়ে তেল-কালি আর শত ক্ষতের দাগ নিয়ে যখন ডেরায় ফিরি, তখন মনে হয় আজকেও তো বেঁচে ফিরলাম। এই লোহার দৈত্যগুলো যেমন সমুদ্রের ঝড় পার করেছে, আমরাও প্রতিদিন জীবনের ঝড় পার করছি।
আবদুল কুদ্দুস (৩৮), লোডার ও লেবার: কাটা প্লেট আর ভারী যন্ত্রাংশ কাদামাটি থেকে কাঁধে বা ছোট ট্রলিতে করে ট্রাকে তোলার কাজ আমাদের। এক একটা লোহার টুকরো শত শত কেজি। পায়ের বুট জুতো কাদার ভেতর আটকে যায়, তার ওপর কাঁধে এই ভার। কোমরে, পিঠে সবসময় চিনচিনে ব্যথা থাকে। অনেক সময় লোহার ধারালো কোনায় কেটে রক্তারক্তি হয়। এই জাহাজের লোহা দিয়ে দেশের বড় বড় দালানকোঠা আর ব্রিজ হচ্ছে, অথচ দিনশেষে আমাদের থাকার জায়গাটা সেই ফুটো টিনের চালাঘরই রয়ে গেল।










