Home First Lead শিপিং খরচ বৃদ্ধির চড়া মাশুল: আমদানি ব্যয় ফুলেফেঁপে শেষ আঘাত ভোক্তার পকেটে

শিপিং খরচ বৃদ্ধির চড়া মাশুল: আমদানি ব্যয় ফুলেফেঁপে শেষ আঘাত ভোক্তার পকেটে

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আন্তর্জাতিক নৌপথের সংকট ও দেশীয় বন্দরের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির দ্বৈত চাপে দেশের আমদানি বাণিজ্যে লজিস্টিকস ব্যয় নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতির মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের সার্বিক ল্যান্ডেড কস্ট বা গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত মোট ব্যয় বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়া এই বাড়তি আর্থিক বোঝা পাইকারি ও খুচরা স্তর পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত আঘাত হানছে সাধারণ ভোক্তার সীমিত আয়ের ওপর, যা জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি একটি পুরো চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে। বৈশ্বিক ফ্রেইট রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে খালাস ও বন্দর সেবার চড়া মাশুল যুক্ত হয়ে আমদানিকারকের প্রাথমিক আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। আমদানিকারকদের পক্ষে এই বাড়তি খরচ অনির্দিষ্টকাল বহন করা সম্ভব হয় না। তাই পণ্যের ক্রয়মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় শিপিং ও হ্যান্ডলিংয়ের বর্ধিত ব্যয়।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধির এই অভিঘাত সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি নির্দিষ্ট ধারায় বাজারকে প্রভাবিত করে। প্রথম ধাপে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় শিপিং খরচ বাড়ার ফলে আমদানিকৃত পণ্যের ল্যান্ডেড কস্ট বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় ধাপে শিল্পোদ্যোক্তা ও আমদানিকারকদের উৎপাদন এবং পাইকারি ক্রয় ব্যয় বেড়ে যায়। তৃতীয় ধাপে কারখানা মালিক ও আমদানিকারকরা বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় করতে পাইকারি পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। চতুর্থ ধাপে খুচরা বিক্রেতারা তাদের লাভ অক্ষুণ্ণ রাখতে পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়াতে বাধ্য হন। সবশেষে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার বর্ধিত ব্যয়ের চূড়ান্ত বোঝা এসে চাপে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে।
শিল্প খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশীয় উৎপাদনমুখী কারখানাগুলো প্রধানত আমদানিকৃত কাঁচামাল এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল। জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় এসব কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, নির্মাণসামগ্রী, ওষুধ এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের উৎপাদন খরচ চড়ে যাচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে বাজারে প্রতিটি পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যে তার সরাসরি প্রতিফলন ঘটছে।
আমদানি পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি ও সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ)-এর চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী।
ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক রুটের দীর্ঘ যাত্রা এবং বৈশ্বিক নানা কারণে যখন ফ্রেইট রেট বেড়ে যায়, তখন তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আমদানি করা পণ্যের ওপর। জাহাজ মালিক বা শিপিং এজেন্টরা এই বাড়তি খরচ একা বহন করতে পারেন না, ফলে তা যুক্ত হয় পণ্যের মোট পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে। আমদানি করা কাঁচামাল কিংবা নিত্যপণ্যের ল্যান্ডেড কস্ট বেড়ে গেলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম বাড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। দিনশেষে এই চড়া খরচের মূল বোঝাটা গিয়ে চাপে দেশের সাধারণ ভোক্তার পকেটেই।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক ফ্রেইট রেটের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু আমাদের নিজেদের বন্দরের অভ্যন্তরীণ ব্যয় ও প্রক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করা পুরোপুরি আমাদের হাতে। চট্টগ্রাম বন্দরে অপ্রয়োজনীয় মাশুল পর্যালোচনা করা, দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করে ডেমারেজ চার্জ কমানো এবং শুল্কায়নসহ সব সেবাকে পুরোপুরি ডিজিটাল করতে পারলে পণ্যের ল্যান্ডেড কস্ট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও গতি নিশ্চিত করা না গেলে আমদানি ব্যয় বারবার বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপকে অসহনীয় করে তুলবে।
খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বেশি সংবেদনশীল। দেশে ভোগ্যপণ্যের একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সমুদ্রপথে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক নৌপথে পরিবহন বিলম্ব এবং বাড়তি ফ্রেইট খরচের কারণে ভোজ্যতেল, গম, চিনি, ডাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলে দক্ষতা বাড়ানো এবং বন্দরের সেবা মাশুল যৌক্তিকীকরণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় লজিস্টিকস ব্যয় সহনীয় রাখা সম্ভব না হলে আমদানি ব্যয়ের এই বাড়তি চাপ বারবার মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।