খাদ্যাভ্যাসে মাংসের আধিক্য কমিয়ে উদ্ভিজ্জ উৎসকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নতুন এক ‘ফুড পিরামিড’ বা খাদ্য নির্দেশিকা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহর ব্রিঘাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির (বিওয়াইইউ) নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাণিজ মাংসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন গ্রহণ করলে হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি থেকে বিশ্বজুড়ে প্রায় দেড় কোটি মানুষের অকাল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
গবেষণা প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞান সাময়িকী ‘অ্যাডভান্সেস ইন নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
কানাডা, চীন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও নর্ডিক দেশগুলোসহ বিশ্বের ১১টি দেশের সরকারি খাদ্য নির্দেশিকা এবং বিখ্যাত ‘ইট-ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ ডায়েট’ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সার্বজনীন রূপরেখা তৈরি করেছেন। এতে সম্পূর্ণ খাবারের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অপরিশোধিত শস্যদানা (হোল গ্রেইন), টাটকা শাকসবজি, ফল ও ডালজাতীয় খাদ্য উপাদানকে। বিপরীতে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় পুরোপুরি পরিহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের নতুন খাদ্য তালিকায় দৈনিক অন্তত পাঁচ সার্ভিং পরিমাণ ফলমূল ও বিভিন্ন রঙের শাকসবজি খাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। খাদ্যতালিকায় থাকা শস্যদানার অন্তত অর্ধেক অংশ হতে হবে লো-গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সমৃদ্ধ এবং গোটা শস্য, যেমন লাল চাল, কিনোয়া কিংবা বাসমতী চাল, যা রক্তে দ্রুত শর্করা বাড়ায় না।
এছাড়া রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিন প্রায় ১২৫ গ্রাম ডাল, মটরশুঁটি, বাদাম বা বীজ এবং ৫০ গ্রাম বিভিন্ন ধরনের আলু খাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
নতুন এই পিরামিডে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের কথা বলা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুসারে, দৈনিক মুরগির মতো সাদা মাংসের পরিমাণ ৩০ গ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়, যা একটি সাধারণ মুরগির বুকের মাংসের এক-চতুর্থাংশ। গরুর মাংসের মতো লাল মাংসের ক্ষেত্রে এই মাত্রা দিনে মাত্র ১৪ গ্রামে সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ এসেছে, যা কার্যত এক টুকরো স্টেক বা মাংসের সমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেড মিট ও প্রক্রিয়াজাত মাংসে থাকা অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি রক্তনালীর ক্ষতি করে এবং এতে ক্যান্সারের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ে।
রান্না ও খাবারের চর্বির ক্ষেত্রে মাখন কিংবা প্রাণিজ চর্বি বাদ দিয়ে অলিভ অয়েল, ক্যানোলা অয়েল বা অ্যাভোকাডো তেলের মতো স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি ব্যবহারের কথা বলেছেন গবেষকরা। দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে দৈনিক মাত্রা ২৫০ গ্রাম বা এক কাপে সীমিত রাখা এবং ফুল-ফ্যাট দুধের পরিবর্তে টক দই বা সয়াদুধকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক কারেন ডেলা কোর্তে জানান, সুষম খাদ্য বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জন্য পুরোপুরি একই রকম হবে না, তবে মূল বিজ্ঞান সবখানেই এক। নিজ নিজ সংস্কৃতির সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী খাদ্য উপাদান—যেমন ডাল, মটরশুঁটি, স্থানীয় মাছ ও তাজা সবজি বাছাই করেই মানুষ এই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করতে পারেন।