বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: দেশের ক্রমবর্ধমান লজিস্টিকস ও বন্দর অবকাঠামো খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও অফ-ডক সুবিধা পরিচালনায় বিদেশি মালিকানার ওপর থাকা দীর্ঘদিনের আইনি সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন থেকে এককভাবে শতভাগ মালিকানা নিয়ে এ দেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।
আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন এই নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে। গত ১১ জুন জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। মূলত স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাণিজ্য-সহায়ক অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং রপ্তানি ও পণ্য পরিবহনের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি সামাল দিতেই এই বড় নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতদিন বিদেশি অপারেটররা কেবল স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের (জয়েন্ট ভেঞ্চার) মাধ্যমে এই খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পেতেন, যেখানে স্থানীয়দের হাতেই সিংহভাগ মালিকানা থাকত। নতুন কাঠামোর অধীনে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এসব স্থাপনা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে পারবে।
খাতসংশ্লিষ্ট অংশীজনরা সরকারের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখছেন। তবে তারা মনে করেন, শুধু মালিকানার বিধিনিষেধ তোলাই যথেষ্ট নয়, বাস্তব বিনিয়োগ টানতে পরিচালনাগত দক্ষতা ও অবকাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২৪টি বেসরকারি আইসিডি চালু রয়েছে, যার কয়েকটিতে যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশীদারিত্ব আছে। এসব আইসিডির সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬ হাজার টিইইউ (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট)। এগুলো প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৯০ হাজার রপ্তানি কনটেইনার, ৫০ হাজার আমদানি কনটেইনার এবং ৬০ হাজার খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে থাকে। এছাড়া আরও তিনটি নতুন আইসিডি নির্মাণাধীন রয়েছে, যা চলতি বা আগামী বছরের মধ্যে চালু হতে পারে। ইতোমধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড, মেডলগ, রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি), এপিএম টার্মিনালস এবং পিএসএ সিঙ্গাপুরের মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক লজিস্টিকস ও বন্দর অপারেটররা বাংলাদেশের এই খাতে বিনিয়োগ করেছে কিংবা গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য জাফর আলম এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় অংশগ্রহণ দেশের লজিস্টিকস খাতের পরিচালনাগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। আন্তর্জাতিক অপারেটররা আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতা নিয়ে আসে, যা সামগ্রিক কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের সেরা চর্চার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জনশক্তি উন্নয়নে অবদান রাখবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ ধরে রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দক্ষ জনশক্তির মতো মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করা আবশ্যক। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চুক্তিতে স্থানীয় কর্মীদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্য দিকে, বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার মাঠপর্যায়ের কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দীর্ঘ দুই দশক ধরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতেই মালিকানার সীমা নির্ধারিত ছিল। এখন শতভাগ সুযোগ দেওয়া হলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত এখানকার পরিচালনাগত সক্ষমতা, শুল্ক নির্ধারণ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার নিশ্চয়তা দেখে তবেই মূলধন বিনিয়োগ করবেন। চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, যোগাযোগ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার ধীরগতি দূর করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ পাওয়া কঠিন হতে পারে। তবে আগামী দুই বছরের মধ্যে নতুন ৩-৪টি আইসিডি চালু হলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের চাহিদা অনায়াসে পূরণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, এই সংস্কারের মাধ্যমে লজিস্টিকস সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও সুসংহত হবে। তবে শেষ পর্যন্ত নীতিগত ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ এই উদারীকরণের সুফল কতটা ঘরে তুলতে পারছে।
নিয়মিত এমন তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন পড়তে businesstoday24.com ফলো করুন