মোহাম্মদ কাউসার:
মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাঁর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাযিল করেছেন মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। এটি কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এক অলৌকিক সংবিধান যা আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে মরুর বুকে অবতীর্ণ হয়েছিল।
অবতরণকাল ও প্রক্রিয়া
পবিত্র কোরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে খণ্ড খণ্ড ভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। এটি সরাসরি কিতাব আকারে আসেনি, বরং সমকালীন প্রয়োজন ও সমস্যার সমাধানে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী হিসেবে প্রেরিত হয়েছে। ওহী আসার প্রধান মাধ্যম ছিলেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)। রাসূল (সা.) বলেছেন, কখনো ওহী ঘণ্টার ধ্বনির মতো আসত, যা ছিল তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর; আবার কখনো জিবরাইল (আ.) মানুষের বেশে এসে ওহী শুনিয়ে যেতেন।
প্রথম ও শেষ অবতরণ
প্রথম ওহী: ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসে লাইলাতুল কদরে। মক্কার অদূরে অবস্থিত জাবালে নূরের হেরা গুহায় প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হয়, যার শুরু ছিল “ইকরা” (পড়ুন) শব্দ দিয়ে।
শেষ ওহী: অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, ১০ হিজরিতে বিদায় হজের সময় আরাফাতের ময়দানে সূরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতটি সর্বশেষ অবতীর্ণ হয় (আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম…)।
কোরআন সংকলনের পর্যায়ক্রম
রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশায় কোরআন প্রধানত সাহাবীদের হৃদয়ে সংরক্ষিত ছিল। তবে ওহী লেখকরা তা খেজুরের ডাল, পাতলা পাথর, পশুর চামড়া এবং উটের হাড়ের ওপর লিখে রাখতেন।
১. প্রথম সংকলন (আবু বকরের আমল): ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফেজ সাহাবী শহীদ হলে হযরত আবু বকর (রা.) কোরআনকে এক মলাটবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। জায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রথম পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।
২. চূড়ান্ত সংকলন (ওসমানের আমল): ইসলামের প্রসার বাড়লে উচ্চারণরীতি নিয়ে যেন বিভ্রান্তি না হয়, সেজন্য হযরত ওসমান (রা.) সেই মূল পাণ্ডুলিপি থেকে সাতটি কপি করে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন। এ কারণেই তাঁকে ‘জামেউল কোরআন’ বলা হয়।
প্রাচীন নিদর্শনের বর্তমান অবস্থান
হ্যাঁ, সে সময়কার কোরআন লিখনশৈলী ও নিদর্শনের কিছু অংশ এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সংরক্ষিত আছে:
বার্মিংহাম কোরআন পাণ্ডুলিপি: যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, যা পার্চমেন্ট বা পশুর চামড়ায় লেখা। কার্বন ডেটিং অনুযায়ী এটি রাসূল (সা.)-এর সমসাময়িক।
তোপকাপি পাণ্ডুলিপি: তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তোপকাপি মিউজিয়ামে হযরত ওসমান (রা.)-এর সময়কার প্রাচীন কপি সংরক্ষিত আছে।
তাশখন্দ পাণ্ডুলিপি: উজবেকিস্তানের তাশখন্দেও প্রাচীন একটি কোরআন সংরক্ষিত রয়েছে।
একনজরে পবিত্র কোরআনের পরিসংখ্যান
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন দিক ও উপাত্তের সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
- মোট সূরা: ১১৪টি।
- মাক্কী সূরা: ৮৬টি (হিজরতের পূর্বে মক্কায় অবতীর্ণ)।
- মাদানী সূরা: ২৮টি (হিজরতের পর মদিনায় অবতীর্ণ)।
- মোট আয়াত: ৬,২৩৬টি (মতামতভেদে ৬,৬৬৬টি)।
- মোট শব্দ: ৭৭,৪৩৯টি।
- মোট অক্ষর: ৩,২৩,৬৭১টি (মতভেদে সামান্য কম-বেশি হতে পারে)।
- মোট পারা: ৩০টি।
- মোট রুকু: ৫৫৮টি।
- মোট সিজদা: ১৪টি।
- প্রথম অবতীর্ণ সূরা: সূরা আলাক (প্রথম ৫ আয়াত)।
- সর্বশেষ অবতীর্ণ পূর্ণাঙ্গ সূরা: সূরা আন-নসর।










