Home চা শিল্প পাতা তোলা ও ছাঁটাইয়ের চিরচেনা সময় হারাচ্ছে চা বাগান

পাতা তোলা ও ছাঁটাইয়ের চিরচেনা সময় হারাচ্ছে চা বাগান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে চলমান জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তীব্র তাপদাহের কারণে চা উৎপাদন খাত এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) একটি বিশেষ ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্বের প্রধান প্রধান চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর, যা সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন ও বাজার মূল্যের স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।
এফএও-র প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণ বদলে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত এবং অসময়ের ভারী বৃষ্টিপাত কিংবা অতিমাত্রায় তাপদাহের কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী চা বাগানগুলোর চিরচেনা উৎপাদন চক্র সম্পূর্ণ ওলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে।
সময়সূচী ও উৎপাদন চক্রে বিপর্যয়
চায়ের গুণগত মান ও সর্বোচ্চ ফলন মূলত নির্দিষ্ট তাপমাত্রা এবং সুষম বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে। তবে সাম্প্রতিক আবহাওয়ার চরম খামখেয়ালিপনার কারণে বাগানগুলোতে পাতা তোলার (Plucking) এবং কচি কুঁড়ি গজানোর চেনা সময় ও মৌসুম বদলে গেছে। এর পাশাপাশি চা গাছের সঠিক বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি প্রক্রিয়া হলো ছাঁটাই (Pruning)। কিন্তু সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া অথবা তীব্র তাপদাহের কারণে এই ছাঁটাইয়ের নিয়মিত চক্রটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চা গাছগুলো তার স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে এবং পাতার গুণগত মানও আগের চেয়ে হ্রাস পাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এশিয়া ও আফ্রিকা
বিশ্বের সিংহভাগ চা উৎপাদিত হয় এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে এই দুই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ চা বাগানগুলোই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। এশিয়া অঞ্চলের শীর্ষ উৎপাদক চীন, ভারত এবং শ্রীলঙ্কার পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলের বাগানগুলোতে দীর্ঘ খরা ও অনাকাঙ্ক্ষিত তাপপ্রবাহের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার পার্বত্য অঞ্চলের সিলন টি এবং ভারতের আসাম ও দার্জিলিংয়ের প্রিমিয়াম কোয়ালিটি চায়ের ফলন এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে বারবার মার খাচ্ছে। অন্যদিকে আফ্রিকার বৃহত্তম ব্ল্যাক টি রপ্তানিকারক দেশ কেনিয়াতেও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে চাষিরা সময়মতো কাঙ্ক্ষিত পাতা তুলতে পারছেন না, যা তাদের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কীটপতঙ্গের আক্রমণ ও মাটির উর্বরতা হ্রাস
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে চা বাগানগুলোতে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ এবং ছত্রাকের আক্রমণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই রোগবালাই দমনে চাষিদের অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করছে। একই সাথে অসময়ের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢালে অবস্থিত চা বাগানের উপরিভাগের উর্বর মাটি ধুয়ে যাচ্ছে, যা পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি করছে।
ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক বাজারের ওপর প্রভাব
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তা যদি বিশ্বজুড়ে আমলে নেওয়া না হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে চায়ের বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই প্রিমিয়াম ও অরগানিক চায়ের দাম আন্তর্জাতিক নিলাম কেন্দ্রগুলোতে চড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এফএও-র পক্ষ থেকে চা উৎপাদনকারী দেশগুলোকে খরা-সহনশীল ও আধুনিক ক্লোন চা গাছ উদ্ভাবন এবং টেকসই ও জলবায়ু-বান্ধব চাষ পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।