বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা:পুঁজিবাজার বর্তমানে এক গভীর কাঠামোগত ও আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে ব্লু-চিপ বা শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো ফ্লোর প্রাইসের আশেপাশে স্থবির হয়ে আছে, সেখানে তথাকথিত ‘জাঙ্ক’ বা পচা শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এই প্রবণতাকে বাজারের জন্য একটি অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকগণ।
দুর্বল শেয়ারের কারসাজি ও গ্যাম্বলিং
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ারের দাম কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ৬০-৭০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এসব কোম্পানির আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এদের দায়ের পরিমাণ সম্পদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এমনকি অনেক কোম্পানির অস্তিত্ব কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে উৎপাদন বা অফিসের কোনো চিহ্ন নেই। গ্যাম্বলাররা কেবল গুজবের ওপর ভিত্তি করে এসব শেয়ারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করছে, যা মূলত তাদের ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা পলায়ন কৌশলের অংশ।
নীতিমালার ফাঁক ও পরিচালকদের অনৈতিক সুবিধা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নীতিমালার শিথিলতাকে পুঁজি করে অনেক ইচ্ছাকৃত খেলাপি পরিচালক বাজারে কারসাজি করার সুযোগ পাচ্ছেন। একদিকে কোম্পানির পরিচালকরা বিলাসী জীবনযাপন করছেন, অন্যদিকে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ এই সংস্কৃতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
ক্যাপিটাল গেইনের মোহ ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট
বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লভ্যাংশের চেয়ে স্বল্পমেয়াদী মূলধনী মুনাফা বা ‘ক্যাপিটাল গেইন’-এর প্রতি ঝোঁক বেশি। গ্রামীণফোন বা স্কয়ার ফার্মার মতো শক্তিশালী শেয়ারগুলো অবহেলিত হওয়ার এটিই প্রধান কারণ। বিনিয়োগকারীরা মনে করেন ভালো শেয়ারে মুনাফা ধীরগতিতে আসে, যার ফলে তারা দ্রুত লাভের আশায় জুয়াড়িদের ফাঁদে পা দিয়ে মূলধন হারাচ্ছেন।
বৈশ্বিক মানদণ্ড বনাম দেশীয় বাস্তবতা
উন্নত বিশ্বের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ভিত্তি হলো কোম্পানির আয় (Earnings) ও লভ্যাংশ (Dividend)। সেখানে তথ্য গোপন বা জালিয়াতির শাস্তি অত্যন্ত কঠোর এবং দুর্বল কোম্পানিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজার থেকে ছিটকে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ‘ওটিসি’ বা ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারগুলোই কারসাজির প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টের অভাব এবং ‘টিপস’ ভিত্তিক বিনিয়োগের সংস্কৃতি সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
উত্তরণের পথ ও দায়িত্বশীলদের ভূমিকা
পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে অস্তিত্বহীন কোম্পানিগুলোকে দ্রুত বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার (Exit Policy) কঠোর আইন প্রয়োজন। পাশাপাশি ঋণ খেলাপিদের পুঁজিবাজারে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও দায়িত্বশীল মহলের উচিত বাজার নিয়ে যে কোনো মন্তব্য করার আগে সতর্ক থাকা, যাতে মাফিয়া চক্র সেই সুযোগ নিতে না পারে। দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতাই পারে পুঁজিবাজারকে এই গভীর সংকট থেকে মুক্ত করতে।
বিজন চক্রবর্তীর পর্যবেক্ষণ
পুঁজিবাজারের বর্তমান অস্থিরতা এবং ‘জাঙ্ক’ শেয়ারের দাপট নিয়ে নর্থ ওয়েস্ট সিকিউরিটিজ-এর পরিচালক বিজন চক্রবর্তী তার সুচিন্তিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, বাজারের এই অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ হতাশা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করছে।
বিজন চক্রবর্তী বলেন, “বিনিয়োগকারীরা যখন দেখেন ভালো শেয়ারগুলো বছরের পর বছর ফ্লোর প্রাইসে আটকে আছে এবং তাদের মূলধন সেখানে স্থবির, তখন তারা মরিয়া হয়ে দ্রুত মুনাফা পাওয়ার আশায় দুর্বল ও কারসাজি হওয়া শেয়ারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এটি একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।”
তিনি বর্তমান সংস্কার ও নীতিমালার বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন:
নীতিমালার অপব্যবহার: বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ সুবিধার কারণে ঋণ খেলাপিরা সুযোগ পাচ্ছে এবং কারসাজি চক্র বা গ্যাম্বলাররা সেই সুবিধাটিই লুফে নিচ্ছে। বিশেষ করে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের যদি সংস্কার বা রিফর্মের প্রয়োজন হয়, তবে গুজব ছড়ানোর সুযোগ না দিয়ে তা দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত।
ব্যক্তি নয়, আইনের সংস্কার: বিজন চক্রবর্তী মনে করেন, পুঁজিবাজারের প্রকৃত সংস্কার কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন দিয়ে সম্ভব নয়। বরং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই এটি নিশ্চিত করতে হবে।
সামগ্রিক জবাবদিহিতা: সংস্কারের আওতায় শুধু ব্রোকার হাউসগুলোকে রাখলে চলবে না। লিস্টিংভুক্ত কোম্পানি এবং তাদের সাথে জড়িত ইস্যু ম্যানেজার, অডিট ফার্ম ও মার্চেন্ট ব্যাংক—প্রত্যেককেই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেন যেন তারা গুজবে কান না দিয়ে কোম্পানির ক্যাশ ফ্লো এবং নিট অ্যাসেট ভ্যালু যাচাই করে বিনিয়োগ করেন। কারণ জাঙ্ক শেয়ারের দাম যেমন দ্রুত বাড়ে, পতনের সময় তা তার চেয়েও দ্রুত সাধারণ মানুষের মূলধন নিঃশেষ করে দেয়।
পুঁজিবাজারের গভীর পর্যবেক্ষণ, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এবং সর্বশেষ আপডেট পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন businesstoday24.com-এ।










