Home অন্যান্য নামের শেষে ‘সিআইপি’: রাষ্ট্রীয় সম্মান কি এখন কেবলই আত্মপ্রচারের হাতিয়ার?

নামের শেষে ‘সিআইপি’: রাষ্ট্রীয় সম্মান কি এখন কেবলই আত্মপ্রচারের হাতিয়ার?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশে ব্যবসায়িক অঙ্গনে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত ‘সিআইপি’ (কমার্শিয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন) পদবিটি এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেবল স্বীকৃতির গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক প্রভাব ও আত্মপ্রচারের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এই মর্যাদা দেওয়া হলেও কতিপয় ব্যবসায়ী এটিকে নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা স্থায়ী উপাধি হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং নানা বিতর্ক।
স্বীকৃতি নাকি সামাজিক আভিজাত্য?
প্রতি বছর দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে রপ্তানি ও শিল্প খাতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় সিআইপি কার্ড প্রদান করে। কার্ডধারীরা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার এবং ভ্রমণে অগ্রাধিকারসহ বিশেষ কিছু প্রটোকল সুবিধা পান।
তবে গত এক দশকে দেখা গেছে, এই কার্ড পাওয়ার পরপরই অনেকে নিজের নামের শেষে স্থায়ীভাবে ‘সিআইপি’ যুক্ত করে নিচ্ছেন। ভিজিটিং কার্ড, সাইনবোর্ড, ব্যানার এমনকি পারিবারিক দাওয়াতপত্রেও ‘আবদুল করিম সিআইপি’ বা ‘রহিমউল্যাহ সিআইপি’ লেখার প্রবণতা এখন তুঙ্গে।
বিশ্লেষকদের নেতিবাচক দৃষ্টি
সমাজবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে এক ধরনের ‘আধুনিক সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ব্রিটিশ আমলে যেমন বিত্তবানরা ‘রায়বাহাদুর’ বা ‘খানবাহাদুর’ উপাধি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের চেয়ে নিজেদের আলাদা ও প্রভাবশালী প্রমাণ করতে চাইতেন, নামের শেষে সিআইপি ব্যবহারের মানসিকতাও ঠিক একই রকম। এটি সমাজে একটি বিশেষ এলিট শ্রেণি তৈরির প্রচেষ্টা, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
আইনি ও নৈতিক সীমাবদ্ধতা
আইনত সিআইপি কোনো ডিগ্রি বা স্থায়ী উপাধি নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের (সাধারণত এক বছর বা পরবর্তী তালিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত) জন্য প্রদত্ত ‘স্ট্যাটাস’। যখন কেউ কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বা পরবর্তী বছরগুলোতে সিআইপি হিসেবে নির্বাচিত না হয়েও এই পরিচয় ব্যবহার করেন, তখন তা নৈতিকভাবে এক ধরনের মিথ্যাচার।
পেশাদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে সফল উদ্যোক্তারা তাদের নামের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং বা কাজের গুণমানকে বেশি গুরুত্ব দেন। সেখানে নামের শেষে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির লেজুড় লাগানোকে অনেক সময় ‘ব্যক্তিত্বের দৈন্য’ বা ‘অহেতুক আত্মপ্রচার’ হিসেবে দেখা হয়।
প্রভাব খাটানোর হাতিয়ার
অভিযোগ রয়েছে, কোন কোন ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ সুবিধা পেতে, প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তার করতে কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য নামের শেষে এই পদবি ব্যবহার করেন। এতে করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের তুলনায় তারা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন, যা সুস্থ ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার অন্তরায়।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অবশ্যই গর্বের বিষয়, তবে সেটিকে নামের অংশ বানিয়ে ফেলা বা প্রভাব খাটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ওই সম্মানের অমর্যাদাই করে। সিআইপি মর্যাদাটি যখন সেবার বদলে কেবল সামাজিক অহংকার প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন এর মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সচেতন মহলের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে এই মর্যাদা ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপব্যবহার রোধ করা যায়।
আমাদের সংবাদ ও আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মন্তব্য জানান।