মাহবুবুল হক, মাস্কাট ( ওমান ): মাস্কাটের ব্যস্ত শহরতলি বাউশারের একটি তিনতলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় লোকচক্ষুর আড়ালে গড়ে উঠেছিল একটি নারী পাচারচক্রের আস্তানা। ওমানের রয়্যাল পুলিশ (ROP) এবং স্পেশাল টাস্ক ইউনিটের যৌথ অভিযানে গত সপ্তাহে তিন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে, যারা এ ঘৃণ্য চক্রের মূল হোতা বলে ধারণা করছে পুলিশ।
অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ছয়জন নারী। তাঁদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশের, বাকি তিনজন থাইল্যান্ড ও লাওসের নাগরিক। নির্জন এক কক্ষে, পর্দা টানা জানালার আড়ালে, এ নারীরা দীর্ঘদিন ধরে পাচার ও নিপীড়নের শিকার ছিলেন। ঘটনাস্থলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এখনো সেই ঘরে পড়ে আছে কিছু ব্যবহৃত পোশাক, প্রসাধনী আর একটি ছেঁড়া চটের বিছানা যা এ নারীদের দুর্বিষহ জীবন যাপনের নীরব সাক্ষী।
‘পার্লার জব’ থেকে পতিতার খাঁচায়
ভুক্তভোগীদের একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি তরুণী জানান, “আমাদের বলা হয়েছিল মাস্কাটে বিউটি পার্লারে চাকরি দেবে। ফ্লাইটের আগেই এজেন্ট সব কাগজ করে দেয়। এখানে আসার পর পাসপোর্ট নিয়ে নেয় ওরা। পরে রাতে লোক পাঠানো হতো…” বলে তিনি চোখ মুছেন। “চেষ্টা করেছিলাম পালাতে। কিন্তু বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। মোবাইলও কেড়ে নেয়। খাবার জোটত দিনে একবার। কোনো উপায় ছিল না।”
আস্তানা ভাঙার পেছনে স্থানীয় ভাড়াটিয়ার তথ্য
ROP সূত্র জানায়, ওই বাড়ির অন্য ফ্ল্যাটে থাকা এক ওমানি নাগরিক প্রথম সন্দেহ করে পুলিশকে জানান। তিনি প্রায়ই মাঝরাতে অচেনা লোকজন আসতে দেখতেন এবং নারীদের কান্নার শব্দ শুনতেন।
এই তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ কয়েক দিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি চালায়। তারপরেই ছদ্মবেশী নারী কর্মকর্তার মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আটক তিন বাংলাদেশি ২-৩ বছর ধরে মাস্কাটে বসবাস করছেন এবং একটি ক্লিনিং কোম্পানির আড়ালে পাচার ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।
বাংলাদেশ থেকে ‘গ্রাহক’ সংগ্রহের কৌশল
এদের এক সহযোগী বাংলাদেশে থেকে নারীদের প্রলোভন দেখাতেন। চট্টগ্রাম ও যশোরের বিভিন্ন দালাল এই চক্রে যুক্ত। মেয়েদের বলা হতো মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করা যাবে। পরিবারকে হাতেভরে টাকা পাঠানোর লোভও দেখানো হতো।
তবে মাস্কাটে পা রাখার পরই শুরু হতো ভয়ংকর বাস্তবতা মানসিক ও যৌন নির্যাতন, পাসপোর্ট আটকে রাখা, এমনকি হুমকি দিয়ে ভিডিও ধারণ করে জিম্মি করে রাখা।
মাস্কাটে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত কয়েকজন বাংলাদেশি বললেন, “মানবপাচারের অনেক ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়, কারণ ভুক্তভোগীরা ভয় পান। আবার কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।”
মাস্কাটে আর কত এমন ঘর অদৃশ্য?
এই একটি বাড়ি থেকে ছয়জন নারী উদ্ধার হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—মাস্কাটের বহুতল ভবনের নিচতলায়, শহরের নিভৃত গলিতে, ঠিক কত নারীর জীবন বন্দি হয়ে আছে অন্ধকারে? আর কত ‘চাকরি’ হবে দুঃস্বপ্নের নাম?
রয়্যাল ওমান পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত অব্যাহত আছে এবং আরও অভিযান চালানো হবে। বাংলাদেশি নারীদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে পাচার বন্ধে দুই দেশের সরকার ও দূতাবাসকে আরও সমন্বিত ভূমিকা নিতে হবে এটাই সময়ের দাবি।










