Home খাবার-দাবার শীতের মিষ্টি স্বাদে বিষের ছোঁয়া: পাটালি গুড়ে বাড়ছে ভেজালের আশঙ্কা

শীতের মিষ্টি স্বাদে বিষের ছোঁয়া: পাটালি গুড়ে বাড়ছে ভেজালের আশঙ্কা

নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: শীত এলেই গ্রামবাংলায় খেজুর গাছ কাটার ধুম পড়ে যায়। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছ থেকে নামানো হয় রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় পাটালি গুড়। একসময় এই পুরো প্রক্রিয়াই ছিল প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যসম্মত। তবে বর্তমানে চাহিদা ও মুনাফা বাড়ায় অনেক জায়গায় এই প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়েছে ভেজাল।

সবচেয়ে বেশি ভেজাল হয় উৎপাদনের সময়। অনেক ক্ষেত্রে খেজুরের রসের সঙ্গে চিনি বা গ্লুকোজ মিশিয়ে গুড়ের পরিমাণ বাড়ানো হয়। এতে খরচ কমে এবং লাভ বাড়ে। আবার কিছু জায়গায় গুড়ের রং গাঢ় ও চকচকে করতে ব্যবহার করা হয় কেমিক্যাল রং বা পোড়া তেলজাতীয় পদার্থ। কোথাও কোথাও দ্রুত গুড় জমাতে বা ঘন করতে ব্যবহার করা হয় রাসায়নিক দ্রব্য, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ভেজাল শুধু উৎপাদনেই নয়, বাজার পর্যায়েও হয়। পুরোনো বা নিম্নমানের গুড় নতুন গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। অনেক সময় আখের গুড়কে খেজুরের পাটালি গুড় বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, কারণ খেজুরের গুড়ের দাম তুলনামূলক বেশি।

ভেজাল পাটালি গুড় চিনতে কিছু লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। প্রথমত, রং। খাঁটি খেজুরের পাটালি গুড় সাধারণত হালকা বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি হয়, কিন্তু অতিরিক্ত কালচে বা অস্বাভাবিক চকচকে হলে সন্দেহ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, গন্ধ। খাঁটি গুড়ে খেজুরের রসের স্বাভাবিক মিষ্টি ঘ্রাণ থাকে। কেমিক্যাল বা পোড়া তেলের গন্ধ পেলে তা ভেজালের ইঙ্গিত। তৃতীয়ত, স্বাদ। খাঁটি গুড়ের মিষ্টতা নরম ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, মুখে তিতা বা ঝাঁঝালো ভাব থাকলে তা ভেজাল হতে পারে।

আরও একটি সহজ পরীক্ষা হলো পানিতে গুলে দেখা। খাঁটি পাটালি গুড় পানিতে গুললে ধীরে ধীরে মিশে যায় এবং পানি হালকা বাদামি হয়। কিন্তু ভেজাল গুড় গুললে নিচে তলানি পড়ে যেতে পারে বা পানি অস্বাভাবিকভাবে ঘোলা হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল গুড় নিয়মিত খেলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে, হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে। তাই শুধু স্বাদের জন্য নয়, স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনা করেও সতর্ক হওয়া জরুরি।

ভেজাল থেকে বাঁচতে বিশ্বস্ত উৎস থেকে গুড় কেনার পরামর্শ দেন তারা। সম্ভব হলে পরিচিত গ্রাম বা নির্ভরযোগ্য উৎপাদকের কাছ থেকে গুড় সংগ্রহ করা ভালো। এছাড়া প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়লেই এই ঐতিহ্যবাহী খাবারকে ভেজালের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

শীতের পাটালি গুড় আমাদের সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের এক অমূল্য অংশ। এই স্বাদ যেন বিষে পরিণত না হয়, সে দায়িত্ব সবার।