Home জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়: জনসেবা নাকি ঋণমুক্তির ‘সুরক্ষাকবচ’?

সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়: জনসেবা নাকি ঋণমুক্তির ‘সুরক্ষাকবচ’?

আমিরুল মোমেনিন, ঢাকা: সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন—যাদের হাজার কোটি টাকা ঋণ এবং ডজন ডজন চেক জালিয়াতির মামলা, তারা কেন সংসদ সদস্য হতে চান? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কাজ করে দুটি মূল উদ্দেশ্য:
ক্ষমতা ব্যবহার করে দায়মুক্তি: সাংসদ হতে পারলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা সহজ হয়। এতে করে ঋণের কিস্তি না দিয়েও পুনরায় রিশিডিউলিং বা সুদ মকুফ (Interest Waiver) করিয়ে নেওয়া যায়।
বিকল্প পথে আয়ের সুযোগ: সংসদ সদস্য হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, টিআর-কাবিখা বা প্রশাসনিক তদবিরের মাধ্যমে আয়ের যে পথ তৈরি হয়, তা দিয়ে তারা ঋণের কিস্তি শোধ করার পরিকল্পনা করেন। অর্থাৎ, জনগণের ট্যাক্সের টাকা বা রাষ্ট্রের সম্পদ পরোক্ষভাবে তাদের পকেটে যায়, যা দিয়ে তারা ব্যাংকের দায় মেটানোর চেষ্টা করেন। এটি অর্থনীতির জন্য একটি ‘দুষ্টচক্র’।
এই টাকা আসলে কার? ব্যাংক কি নিজের পকেট থেকে টাকা দেয়?
অনেকে মনে করেন ব্যাংক হয়তো তার নিজস্ব টাকা দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো:
এটি জনগণের আমানত: ব্যাংকের ভল্টে থাকা টাকা ব্যাংকের নিজের নয়। এটি আপনার, আমার এবং দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয়। মানুষ তার কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে রাখে নিরাপত্তার জন্য এবং সামান্য মুনাফার আশায়।
জনগণের টাকার অপচয়: যখন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেন না, তখন প্রকৃতপক্ষে তিনি ব্যাংকের নয়, বরং সাধারণ আমানতকারীদের টাকা আত্মসাৎ করেন।
ব্যাংক কি টাকা কাটতে পারে না?
তাত্ত্বিকভাবে ব্যাংক তাদের হিসাব থেকে টাকা কেটে নিতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না কারণ:
তহবিল শূন্যতা: অধিকাংশ বড় খেলাপিরা ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়ার পর তা নগদ আকারে সরিয়ে ফেলেন বা বেনামে অন্য ব্যবসায় খাটান। ফলে তাদের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে ব্যাংক কাটার মতো পর্যাপ্ত টাকা থাকে না।
আইনি জটিলতা: মামলা চলাকালীন বা রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক অনেক সময় কঠোর হতে পারে না।
আমানতকারীর ওপর প্রভাব: ব্যাংক যখন ঋণ আদায় করতে পারে না, তখন সেই ঘাটতি মেটাতে সাধারণ মানুষের আমানতের ওপর সুদের হার কমিয়ে দেয় অথবা সেবার মাশুল বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, প্রভাবশালীদের ঋণের বোঝা পরোক্ষভাবে সাধারণ জনগণকেই বইতে হয়।
কিভাবে তারা পুনরায় টাকা পান?
সম্পদের চেয়ে বেশি ঋণ থাকার পরও তারা যেভাবে পুনরায় টাকা পান, তাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘এভারগ্রিনিং’ (Evergreening)
পুরানো ঋণ শোধ না করেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নতুন করে প্রকল্প দেখিয়ে আবার ঋণ নেওয়া হয়।
অনেক সময় এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালকের সাথে যোগসাজশ করে ‘পারস্পরিক ঋণ’ সুবিধা নেন। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

জনগণের পকেট থেকে প্রভাবশালীদের সিন্দুকে
সাধারণ মানুষ যখন সামান্য ঋণের জন্য জেল খাটেন, তখন প্রভাবশালীরা কয়েক হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়েও আইনপ্রণেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এটি কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং একটি পরিকল্পিত আর্থিক অপরাধ। এর ফলে দেশের ব্যাংকিং খাত দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় সাধারণ করদাতা ও আমানতকারীদের।