Home First Lead প্লেটে বিষ: সামুদ্রিক মাছে ভারী ধাতুর আতঙ্ক

প্লেটে বিষ: সামুদ্রিক মাছে ভারী ধাতুর আতঙ্ক

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: মাছে-ভাতে বাঙালি—এই চিরায়ত পরিচয় এখন এক অদৃশ্য হুমকির মুখে। আমাদের প্রোটিনের প্রধান উৎস সামুদ্রিক মাছের শরীরে বাসা বেঁধেছে বিষাক্ত সব ভারী ধাতু। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জনপ্রিয় ১২টি সামুদ্রিক মাছের নমুনায় সিসা এবং ক্রোমিয়ামের মতো ভয়াবহ ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
গবেষণার বিস্তারিত: কারা, কখন এবং কোথায়?
এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন একদল বাংলাদেশি গবেষক। যার নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ আনিসুর রহমান এবং তার সাথে ছিলেন ইশরাত জাহান, সৈয়দা সাইমা আলম, লিঙ্কন চন্দ্র শীল, আসিফ মাহমুদ দিহান ও আবদুল্লাহ আল মামুন। গবেষণাটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ পায়।
গবেষক দল সরাসরি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন মাছের বাজার থেকে ১২টি জনপ্রিয় প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত মাছের নমুনাগুলো গবেষণাগারে অ্যাটমিক অ্যাবসর্পশন স্পেকট্রোফটোমেট্রি পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়। এটি এমন একটি সূক্ষ্ম পদ্ধতি যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণে থাকা ধাতুর অস্তিত্বও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে।
ভয়াবহতার চিত্র: কোন মাছে কী ধাতু?
গবেষণা অনুযায়ী, মাছগুলোতে ধাতুর ঘনত্বের তালিকায় সবার উপরে ছিল লোহা, এরপর পর্যায়ক্রমে নিকেল, সিসা, তামা, ম্যাঙ্গানিজ এবং ক্রোমিয়ামের অবস্থান। লোহা প্রাকৃতিকভাবে থাকলেও সিসা ও ক্রোমিয়ামের উচ্চ মাত্রা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগের। গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশ ও রূপচাঁদা মাছে সিসা ও ক্রোমিয়াম দুটির মাত্রাই বিপদসীমার উপরে। লইট্টা বা বোম্বাই ডাক মাছের ক্ষেত্রে সিসার পরিমাণ পাওয়া গেছে অত্যন্ত বেশি। এছাড়া চোক্কা মাছ এবং টুনা মাছের নমুনায় উচ্চ মাত্রার সিসা ও ক্রোমিয়াম শনাক্ত করা হয়েছে, যা নিয়মিত খাওয়ার জন্য নিরাপদ নয়।
কেন এই সিসা ও ক্রোমিয়াম বিপজ্জনক?
গবেষণায় দেখা গেছে যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি নিয়মিত এই মাছগুলো গ্রহণ করেন, তবে তার শরীরে সিসা ও ক্রোমিয়াম প্রতিদিন গ্রহণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত সিসা মানবদেহে রক্তশূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা এবং মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। অন্যদিকে, ক্রোমিয়ামের উচ্চ মাত্রা দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্ট, আলসার এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি তৈরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দূষণের নেপথ্যে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ: গবেষক দলের মতে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য, শিল্পকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সমুদ্রে মিশে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। সমুদ্রের তলদেশের চেইন বা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই বিষ সরাসরি মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, নিয়মিত এই দূষিত মাছ গ্রহণ করা হলে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

আগামী পর্বে পড়ুন: মাছের চাকে অদৃশ্য শত্রু—কীভাবে এই মাছগুলো আপনার লিভার ও কিডনি বিকল করে দিচ্ছে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কতটা বেড়েছে।