কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ঘেরা চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা এখন দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান হাবে পরিণত হয়েছে। একদিকে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ উপকূল, অন্যদিকে উপজেলার পূর্ব প্রান্তে পাহাড়ের সারি—এই ভৌগোলিক অবস্থানই আনোয়ারাকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য একটি আকর্ষণীয় অঞ্চলে পরিণত করেছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ ও নিকটবর্তী সমুদ্র ব্লকের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এই অঞ্চলে জ্বালানি সম্পদের বড় ধরনের মজুদ থাকার জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রাথমিক জরিপ
আনোয়ারায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাস বেশ পুরনো। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের ষাটের দশক পর্যন্ত চট্টগ্রামের পাহাড়ি বেল্ট ও উপকূলীয় এলাকায় একাধিক জরিপ চালানো হয়। তৎকালে শেল অয়েল কোম্পানি (Shell Oil) এই অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক মানচিত্র তৈরি করেছিল। যদিও সে সময় পটিয়ার ‘বুদবুড়ি চড়া’ বা বাঁশখালীর ‘জলদি’ কূূপের মতো এখানে সরাসরি গভীর খননকার্য চালানো হয়নি, তবে প্রাথমিক জরিপগুলোতে আনোয়ারাকে একটি উচ্চ সম্ভাবনাময় ‘হাইড্রোকার্বন স্ট্রাকচার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সমুদ্র ব্লকের গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির তৎপরতা
অনুসন্ধানে জানা যায়, আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় সীমানা মূলত বঙ্গোপসাগরের অগভীর সমুদ্র ব্লকগুলোর সাথে সংযুক্ত। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অস্ট্রেলীয় কোম্পানি ‘সান্তোস’ (Santos) এবং পরবর্তীতে ‘কেয়ার্ন এনার্জি’ আনোয়ারা সংলগ্ন সাগরে ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। বিশেষ করে ‘ম্যাগনামা স্ট্রাকচার’, যা আনোয়ারা উপকূলের খুব কাছে অবস্থিত, সেখানে গ্যাসের শক্তিশালী অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তীতে আনোয়ারা উপকূল সংলগ্ন ব্লক এসএস-০৪ (SS-04) এ ত্রিমাত্রিক (3D) সিসমিক জরিপ হয়েছে। এসব জরিপের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উপকূলীয় মাটির গভীরে উচ্চ চাপের গ্যাস স্তরের উপস্থিতি রয়েছে, যা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলছে।
ভূ-তাত্ত্বিক সাদৃশ্য ও সম্ভাবনা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের পটিয়ার পাহাড়ি এলাকা এবং বাঁশখালীর জলদি পাহাড়ের যে গঠন, তার একটি ধারাবাহিক অংশ আনোয়ারার পাহাড়ি অঞ্চলে বিস্তৃত। পটিয়ার বুদবুড়ি চড়ায় মাটির নিচ থেকে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হওয়া প্রমাণ করে যে, এই বেল্টের ভূ-গর্ভস্থ স্তরে গ্যাসের সক্রিয় উৎস রয়েছে। আনোয়ারা উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এখানে ‘অফশোর’ এবং ‘অনশোর’ উভয় ধরনের মজুদের সম্ভাবনা দেখছেন ভূতাত্ত্বিকরা।
বর্তমান অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) থেকে প্রাপ্ত গ্যাস আনোয়ারায় পাইপলাইনের মাধ্যমে আসে এবং বড় দুটি সার কারখানা (সিইউএফএল ও কাফকো) থাকায় এই অঞ্চলটি ইতিমধ্যে দেশের গ্যাস গ্রিডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রসীমা জয়ের পর সরকারের নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ডে আনোয়ারা উপকূল সংলগ্ন ব্লকগুলো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর বিশেষ নজরে রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গভীর সমুদ্রের পাশাপাশি আনোয়ারার পাহাড়ি অংশেও নতুন করে অনুসন্ধান চালানোর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে আনোয়ারা উপকূলে বড় কোনো তেল বা গ্যাস ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। যা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।