Home First Lead সংসদ নির্বাচন : ডিজিটাল প্রচারণায় নজিরবিহীন কড়াকড়ি

সংসদ নির্বাচন : ডিজিটাল প্রচারণায় নজিরবিহীন কড়াকড়ি

 বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’-এ প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গুজব, ফেক নিউজ এবং চরিত্র হনন রুখতে এই বিধিমালাকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের জারি করা প্রজ্ঞাপনের ১৬ ও ২২ নম্বর বিধিতে ডিজিটাল প্রচারণা ও নির্বাচনী ব্যয়ের বিষয়ে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তার মূল বিষয়গুলো এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।

১. এআই (AI) ও ডিপফেকের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনে ‘ডিপফেক’ ভিডিও বা অডিওর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিধিমালার ১৬(ছ) বিধিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল প্রতিপক্ষের চরিত্র হনন বা ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence – AI) ব্যবহার করে কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা বিকৃত আধেয় (Content) তৈরি করতে পারবে না। অর্থাৎ, কারো ছবি বা ভিডিও এডিট করে ভুল বার্তা ছড়ানো এখন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২. যাচাই ছাড়া শেয়ার বা পোস্ট নয়

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো তথ্য পেলেই তা যাচাই ছাড়া শেয়ার করা যাবে না। বিধিমালার ১৬(চ) বিধি অনুযায়ী, ‘সত্যতা যাচাই (Fact-check) ব্যতিরেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করা যাবে না।’ এটি প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের কর্মী-সমর্থকদের জন্যও প্রযোজ্য। এর মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর দায় সরাসরি প্রার্থীর ওপর বর্তাবে।

৩. ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে বিদেশি অর্থায়ন নিষিদ্ধ

নির্বাচনী প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (যেমন- ফেসবুক, ইউটিউব) এখন প্রধান হাতিয়ার। তবে এখানে খরচের লাগাম টানতে কঠোর হয়েছে কমিশন।

খরচের হিসাব: বিধিমালার ২২(৪) বিধি অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণার সব খরচ প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিদেশি অর্থায়ন: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২২(৫) বিধি। এতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণায় বিদেশি অর্থায়নে কোনো বিজ্ঞাপন (Sponsored Ads) প্রদান করা যাবে না। এর ফলে বিদেশ থেকে অর্থ ঢেলে জনমত পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধ হবে।

৪. ঘৃণা ছড়ানো ও চরিত্র হনন

অনলাইনে প্রতিপক্ষ, নারী বা সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ঘৃণা ছড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। ১৬(ঘ) বিধি মতে, প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য (Hate Speech), ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। কারো ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন বা চেহারা বিকৃত করাও নিষিদ্ধ (বিধি ১৬-গ)।

৫. আইন অমান্য করলে কঠোর শাস্তি

ডিজিটাল প্রচারণার এই নিয়মগুলো কেবল কাগুজে বাঘ নয়। বিধিমালা লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে ২৭ বিধি অনুযায়ী অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এই জরিমানা ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হলো ২৮ বিধি—কমিশন যদি তদন্তে প্রমাণ পায় যে কোনো প্রার্থী ডিজিটাল মাধ্যমে গুরুতর অপরাধ করেছেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা কমিশনের হাতে রাখা হয়েছে।

২০২৫ সালের এই আচরণ বিধিমালা ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে মাঠ পর্যায়ে, বিশেষ করে সাইবার স্পেসে হাজার হাজার কনটেন্টের ভিড়ে এই নজরদারি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।