লন্ডনের চিঠি
আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন :
সাদা মেঘের আনাগোনা আর টেমস নদীর শীতল হাওয়ায় ঘেরা লন্ডনের ক্যাফেগুলোতে আজকাল কফির কাপে ধোঁয়া ওঠার চেয়েও বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে সিলেটের রাজনীতির আলোচনা। বৃহত্তর সিলেটের এমন কোনো পরিবার বোধহয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যার অন্তত একজন সদস্য লন্ডনে নেই। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই অভিবাসন এখন কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে সিলেটের স্থানীয় রাজনীতির এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক।
পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বা ব্রিক লেনে হাঁটলে মনে হবে আপনি সিলেটের কোনো ব্যস্ত পাড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। এখানকার রেস্তোরাঁ ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়—আগামী নির্বাচনে কে হচ্ছেন প্রার্থী? কোন দল কাকে মনোনয়ন দিচ্ছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর ভিডিও কলের কল্যাণে লন্ডন প্রবাসীরা এখন চব্বিশ ঘণ্টা যুক্ত থাকছেন নিজ গ্রামের মানুষের সাথে। কার জনসমর্থন বেশি, কার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে—তার চুলচেরা বিশ্লেষণ লন্ডনের ড্রয়িংরুম থেকেই করা হচ্ছে।
সিলেটের নির্বাচনে প্রবাসীদের প্রভাব কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় প্রার্থীরাও জানেন, লন্ডনের সমর্থন মানেই বড় অংকের নির্বাচনী ফান্ড। প্রবাসীরা তাদের পছন্দের প্রার্থীর জন্য উদার হস্তে অর্থ ব্যয় করেন। পোস্টার ছাপানো থেকে শুরু করে বড় বড় জনসভা—সবকিছুর পেছনে থাকে ‘লন্ডনী’ পাউন্ডের ছোঁয়া। অনেক ক্ষেত্রে লন্ডন প্রবাসী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা যে প্রার্থীকে সমর্থন দেন, এলাকার সাধারণ ভোটারদের ওপর তার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কাজ করে।
বিগত কয়েক বছরে একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেবল অর্থায়ন নয়, প্রবাসীদের অনেকেই এখন সরাসরি রাজনীতিতে নামছেন। অনেকে বিলেতের নাগরিকত্ব বা সুখের জীবন ছেড়ে শেকড়ের টানে সিলেটে গিয়ে প্রার্থী হচ্ছেন। কেউ কেউ সফলও হয়েছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের এই অংশগ্রহণ একদিকে যেমন মেধা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।
নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে সিলেটগামী ফ্লাইটে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। একে স্থানীয়রা মজা করে বলেন ‘ভোটের মৌসুমে বড় জাহাজের আগমন’। শত শত প্রবাসী সশরীরে এলাকায় গিয়ে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামেন। তাদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনের মাঠকে আরও উৎসবমুখর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলে।
সিলেটের রাজনীতি আর লন্ডন—একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সাগর পাড়ি দিয়ে প্রবাসীরা দূর দেশে থাকলেও তাদের মন পড়ে থাকে সুরমা-কুশিয়ারার তীরে। এই প্রবাসীদের আবেগ, অর্থ আর সক্রিয়তা সিলেটের প্রতিটি নির্বাচনকে এক অনন্য রূপ দেয়, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো অঞ্চলে সচরাচর দেখা যায় না।
আপনি কি সিলেটের রাজনৈতিক বিবর্তনে প্রবাসীদের আরও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চান?










