Home আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে ‘ডিজিটাল জলদস্যুতা’: পণ্য চুরি ও জালিয়াতির নতুন আতঙ্ক

শিপিং রুটে ‘ডিজিটাল জলদস্যুতা’: পণ্য চুরি ও জালিয়াতির নতুন আতঙ্ক

দুই বছরে  ১ লাখ ৬০ হাজার  চুরির ঘটনা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বিশ্বজুড়ে সমুদ্র ও স্থলপথের সাপ্লাই চেইন এখন এক নতুন সংকটের মুখোমুখি। গত দুই দিনে আন্তর্জাতিক বীমা সংস্থা IUMI (International Union of Marine Insurance) এবং পণ্য সুরক্ষা সংস্থা TAPA EMEA যৌথভাবে একটি ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা উচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বছরে (২০২২-২০২৪) বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার পণ্য চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ইউরো।
রাজপথ থেকে সাইবার জগতে স্থানান্তর: প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো চুরির ধরনের পরিবর্তন। আগে যেখানে মাঝপথে ট্রাক বা জাহাজ থামিয়ে লুটতরাজ হতো, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ‘ডিজিটাল ফ্রড’ বা অনলাইন জালিয়াতি।
অপরাধীরা সরাসরি আক্রমণ না করে বরং ডিজিটাল পরিচয় চুরি করে বৈধ শিপিং কোম্পানি বা ক্যারিয়ার সেজে মালামাল নিজেদের কবজায় নিয়ে নিচ্ছে। বীমা বিশেষজ্ঞরা একে ‘অ্যাসফাল্ট থেকে সাইবার স্পেসে রূপান্তর’ বলে অভিহিত করছেন।
বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়াকে সংযোগকারী ট্রান্স-প্যাসিফিক রুটে এই জালিয়াতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালে শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য চুরি হয়েছে। অপরাধীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে জাল ইমেইল, ভুয়া ওয়েবসাইট এবং ক্লোন করা শিপিং ডকুমেন্ট তৈরি করছে, যা খালি চোখে চেনা প্রায় অসম্ভব।
 যেভাবে ঘটছে এই ‘ফ্যান্টম ক্যারিয়ার’ জালিয়াতি
পরিচয় চুরি: অপরাধীরা নামী শিপিং কোম্পানির লোগো এবং নাম ব্যবহার করে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করছে।
ভুয়া বীমা সনদ: মালামাল নেওয়ার সময় তারা নিখুঁত ভুয়া ডিজিটাল বীমা ও লাইসেন্স দেখাচ্ছে।
AI-এর ব্যবহার: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তারা শিপিং এজেন্টদের সাথে এমনভাবে যোগাযোগ করছে যে, কোনো সন্দেহ ছাড়াই মালামাল তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
ঝুঁকিতে থাকা পণ্যসমূহ:
আগে কেবল দামি ইলেকট্রনিক্স বা অলঙ্কার চুরির লক্ষ্য থাকলেও এখন চাল, ডাল, বেবি ফর্মুলা এবং ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। উত্তর আমেরিকায় উচ্চ মূল্যের লিকুইড কার্গো (যেমন- পানীয়র বড় চালান) কোনো সহিংসতা ছাড়াই স্রেফ জালিয়াতির মাধ্যমে উধাও হওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
উত্তরণের উপায় ও সুপারিশ:
বীমা সংস্থাগুলো শিপিং কোম্পানি এবং ফরোয়ার্ডারদের জন্য বেশ কিছু জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে:
মাল্টি-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন: শুধু ইমেইলে নয়, পণ্য হস্তান্তরের আগে সরাসরি ফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা।
রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং: প্রতিটি কনটেইনারে জিপিএস ট্র্যাকার এবং স্মার্ট লক ব্যবহার করা।
সতর্কতা: রুট পরিবর্তন বা শেষ মুহূর্তে চালকের তথ্য বদলানোর মতো অনুরোধ আসলে সেটিকে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে গণ্য করা।
বিশ্ব বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এখন কেবল সমুদ্রের জলদস্যু নয়, বরং কম্পিউটারের পেছনে বসে থাকা ডিজিটাল অপরাধীদের রুখতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।