সিপিডির গোলটেবিল বৈঠকে শঙ্কা
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: দেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, বিনিয়োগ মন্দা এবং রপ্তানির মন্থর গতির কারণে এক গভীর চাপের মুখে রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত এবং বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন: স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এই অভিমত তুলে ধরা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা সংস্কারগুলো নতুন সরকারকেও অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যথায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব হবে না।
সিপিডির মূল প্রবন্ধে নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন দেখিয়েছেন, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.২ শতাংশ থেকে কমে ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কিছুটা পুনরুদ্ধার লক্ষ্য করা গেছে, তবে শিল্প উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকা এবং সেবা খাতে ভোগ কমে যাওয়া বড় উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৭৮ শতাংশে নেমে আসা এবং ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে সংকুচিত করছে।
বক্তাদের মতে, বিনিয়োগকারীরা যদি দীর্ঘমেয়াদী নীতির নিশ্চয়তা না পান, তবে তারা নতুন প্রকল্পে এগোবেন না, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
ব্যবসায়ী নেতা ও আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ ব্যাংক খাতের করুণ চিত্র তুলে ধরে জানান, সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কারা নিয়েছে এবং কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? যখন সরকারি ঋণের ৫৮ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে বেতন, সুদ ও ভর্তুকির মতো অনুৎপাদনশীল খাতে, তখন বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশে আটকে থাকা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। ১০ শতাংশ গ্যাস চুরি হওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে তিনি উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৈঠকে জানান, সরকার গতানুগতিক ভোগভিত্তিক প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে বিনিয়োগভিত্তিক টেকসই মডেলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৈরি হওয়া ঋণের পাহাড় সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি সামাজিক সুরক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতের ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমাতে ‘রিনেগোশিয়েশন’ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম মনে করিয়ে দেন যে, যে কোনো পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে তার প্রশাসনিক বাস্তবায়নের ওপর, যা বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নতুন সরকারের সামনে সময় খুবই সীমিত এবং চ্যালেঞ্জ পাহাড়সমান। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানো এবং এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী কৌশল প্রণয়নে এখনকার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।
businesstoday24.com ফলো করুন ।