আমাদের চারপাশে এমন মানুষের অভাব নেই যারা নিজেদের কর্মদক্ষতাকে আকাশচুম্বী করে দেখাতে ভালোবাসেন। সামান্য একটি দাপ্তরিক কাজ কিংবা ছোটখাটো সামাজিক দায়িত্ব পালন করেই তারা এমন এক আবহ তৈরি করেন, যেন তাদের অনুপস্থিতিতে পুরো সিস্টেম অচল হয়ে পড়ত। দশ টাকার কাজকে লাখ টাকার মহিমা দেওয়া এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কেবল নিছক অহংকার নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ।
অতিরঞ্জনের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতাকে অনেক সময় ‘সেলফ-এনহ্যান্সমেন্ট বায়াস’ (Self-enhancement Bias) বলা হয়। এটি এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া যেখানে ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা ও অর্জনকে বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি বড় করে দেখেন। এর মূল কারণ হলো নিজের আত্মমর্যাদাকে (Self-esteem) অন্যদের চোখে উঁচুতে রাখা। যখন একজন ব্যক্তি তার দু ঘণ্টার কাজকে কয়েক দিনের পরিশ্রম হিসেবে দাবি করেন, তখন তিনি মূলত সমাজে নিজের ‘অপরিহার্যতা’ বা ‘ইন্ডিসপেনসিবিলিটি’ প্রমাণ করতে চান।
এটি এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা থেকেও জন্মাতে পারে; ব্যক্তি ভয় পান যে সাধারণ কাজকে সাধারণ হিসেবে উপস্থাপন করলে তিনি অন্যদের কাছে গুরুত্ব হারাবেন।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট ও ডোপামিন
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই আচরণের একটি চমৎকার ব্যাখ্যা হলো ‘ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট’ (Dunning-Kruger Effect)। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের দক্ষতা তুলনামূলক কম, তারা নিজেদের সক্ষমতাকে অনেক বেশি বাড়িয়ে বলার প্রবণতা দেখান। বিপরীতে, প্রকৃত দক্ষ ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজেদের কাজকে খুব সহজ বা সাধারণ মনে করেন।
এছাড়া, যখন কেউ নিজের বড় কোনো অর্জনের কথা শোনায় এবং চারপাশ থেকে বাহবা বা মনোযোগ পায়, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন (Dopamine) নামক ‘ফিল গুড’ হরমোন নিঃসরণ হয়। এই সাময়িক আনন্দের নেশায় তারা বারবার ছোট কাজকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করতে প্রলুব্ধ হন।
রাজনীতিবিদ বা সামাজিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে এটি একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, কারণ জনমনে ‘ব্যস্ত’ ও ‘পরিশ্রমী’ ভাবমূর্তি তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সামাজিক প্রভাব ও অপরিহার্য হওয়ার প্রবণতা
আমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামোতে ‘ব্যস্ততা’কে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। যে যত বেশি ব্যস্ত, সে তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এই ভুল ধারণাটি মানুষকে মিথ্যা কৃতিত্ব নিতে প্ররোচিত করে। সরকারি বা বেসরকারি কর্মকর্তারা অনেক সময় ঊর্ধ্বতনদের সন্তুষ্ট করতে বা অধস্তনদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে এই ‘অপরিহার্য’ হওয়ার নাটক করেন। এটি কাজের গুণগত মান বৃদ্ধির চেয়ে ব্যক্তিগত প্রচারণাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
পরিশেষে, কাজকে কাজের চেয়ে বড় করে দেখানোর এই ব্যাধি সুস্থ সামাজিক সম্পর্কের পথে বাধা। প্রকৃত কাজ সবসময়ই তার স্বাক্ষর রেখে যায়, মুখে বড় বড় বুলিতে তাকে সাজানোর প্রয়োজন পড়ে না। যারা সত্যিকারের কাজ করেন, সমাজ তাদেরই মনে রাখে, অতিরঞ্জিত গল্প বলা ‘অপরিহার্য’ মানুষদের নয়।