Home Second Lead ঠকবাজির হাট: পচা মাছ যখন রঙিন বিষ

ঠকবাজির হাট: পচা মাছ যখন রঙিন বিষ

শামসুল ইসলাম, ঢাকা: বাজারে চকচকে লাল কানকো আর গায়ের রুপালি আভা দেখে ভাবছেন মাছটি একদম টাটকা? সাবধান! আপনার চোখের সামনে সাজিয়ে রাখা ওই মাছটি হতে পারে কয়েকদিন আগের বাসি কিংবা মরা মাছ। অসাধু ব্যবসায়ীরা পচা মাছকে ‘টাটকা’ সাজাতে এখন ব্যবহার করছে টেক্সটাইল ডাই বা কাপড়ের রং এবং স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল।
লাল রং ও কৃত্রিম উজ্জ্বলতার কারসাজি
মাছ পচে গেলে সাধারণত এর কানকো ফ্যাকাসে বা কালচে হয়ে যায়। ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করতে বিক্রেতারা সিরিঞ্জ দিয়ে বা সরাসরি কানকোতে লাল রং মেখে দিচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মাছের গায়ের পিচ্ছিল ভাব ও উজ্জ্বলতা বজায় রাখতে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত পানিতে মাছ চুবিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে করে দূর থেকে মাছটিকে গভীর সমুদ্র বা নদী থেকে সদ্য ধরা মাছের মতো মনে হয়।
ফরমালিন ও বিষাক্ত প্রিজারভেটিভের ব্যবহার
মাছ দীর্ঘক্ষণ পচনমুক্ত রাখতে এবং পচা দুর্গন্ধ দূর করতে মাছের পেটে ও গায়ে মাখানো হচ্ছে ফরমালিন। এ ছাড়াও বরফের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল। এর ফলে মাছ বাইরে থেকে শক্ত ও অবিকৃত থাকলেও ভেতরে আসলে পচন ধরে যায় এবং এর প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: শরীরে ঢুকছে নীরব ঘাতক
এসব রং ও রাসায়নিক মিশ্রিত মাছ খাওয়ার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে পেটের পীড়া বা ফুড পয়জনিং হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব খাবার মানবদেহে প্রবেশের ফলে কিডনি বিকল হওয়া, লিভারের ক্ষতি এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এই ‘বিষাক্ত মাছ’ ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে।
নকল টাটকা মাছ চেনার উপায়
  • রঙের পরীক্ষা: কানকো অতিরিক্ত লাল মনে হলে হাত দিয়ে বা টিস্যু দিয়ে ঘষে দেখুন। হাতে রং লেগে আসলে বুঝবেন এটি কৃত্রিম।
  • গন্ধ ও গঠন: টাটকা মাছের একটি স্বাভাবিক আঁশটে গন্ধ থাকে, কিন্তু কেমিক্যাল মেশানো মাছের কোনো স্বাভাবিক গন্ধ থাকে না। টিপ দিলে মাছ দেবে গেলে বা নরম হয়ে থাকলে সেটি বাসি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • চোখ পরীক্ষা: টাটকা মাছের চোখ স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল থাকে। কেমিক্যাল মেশানো বা মরা মাছের চোখ ঘোলাটে ও ভেতরের দিকে দেবে যায়।
ক্রেতাদের চোখে প্রতারণার ধরণ
একজন নিয়মিত বাজার করা ক্রেতা বলেন, “বাজার থেকে মাছ কিনে বাসায় নেওয়ার পর ধুতে গিয়ে দেখি কানকোর লাল রং পানির সাথে ধুয়ে যাচ্ছে। মাছের ভেতরটা একদম নরম আর দুর্গন্ধ। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে এটা এতটা পচা।”
স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
আরেকজন সচেতন ভোক্তা জানান, “আমরা তো পরিবারের পুষ্টির জন্য মাছ কিনি। কিন্তু মাছের সাথে যদি আমরা কাপড়ের রং আর ফরমালিন খাই, তবে তো সুস্থ থাকার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ব। বিশেষ করে বাচ্চাদের নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকি।”
কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের দাবি
সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু অভিযান চালালে হবে না, উৎস স্থলেই ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোক্তাদের মতে, “ব্যবসায়ীরা জানে ধরা পড়লে অল্প কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে পার পাওয়া যাবে। যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা জেল দেওয়া হতো, তবে কেউ মানুষের জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার সাহস পেত না।”
ভোক্তারা মনে করেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম বৃদ্ধি করলে এই ‘ঠকবাজির হাট’ বন্ধ করা সম্ভব।
আরও নানা বিষয় জানতে ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com