Home আন্তর্জাতিক যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতি কঠোরকরণ: শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধাক্কা

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতি কঠোরকরণ: শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধাক্কা

আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন: নেট মাইগ্রেশন বা নিট অভিবাসন কমিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং দেশের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে যুক্তরাজ্য (ব্রিটেন) তাদের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের কঠোরতা আরোপ করেছে। সরকারের “রিস্টোরিং কন্ট্রোল ওভার দি ইমিগ্রেশন সিস্টেম” শ্বেতপত্রের আলোকে হোম অফিস ২০২৬ সালে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন বাস্তবায়ন শুরু করেছে, যা দেশটির পয়েন্ট-ভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থাকে আরও জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এই কড়াকড়ির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদেশি দক্ষ কর্মী এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর।

দক্ষ কর্মীদের জন্য বেতন ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সীমা বৃদ্ধি
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ দক্ষ কর্মী (Skilled Worker Visa) ক্যাটাগরিতে স্পনসরশিপ পাওয়ার জন্য ন্যূনতম বার্ষিক বেতনের সীমা বাড়িয়ে ৪১,৭০০ পাউন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এখন থেকে প্রতিটি পেশার জন্য নির্ধারিত ‘গোয়িং রেট’ (নির্দিষ্ট কাজের জন্য স্ট্যান্ডার্ড বেতন) ১০০ শতাংশ পূরণ করতে হবে। এর ফলে যদি কোনো পেশার বাজারমূল্য ৪১,৭০০ পাউন্ডের বেশি হয়, তবে নিয়োগকর্তাকে সেই উচ্চ বেতনই দিতে হবে।
পাশাপাশি, যোগ্যতার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনে কাজের দক্ষতার স্তর বাড়িয়ে ‘RQF Level 6’ (যা স্নাতক বা ব্যাচেলর ডিগ্রির সমমান) করা হয়েছে। এই নতুন যোগ্যতার নিয়মের কারণে এর আগে অনুমোদিত প্রায় ১১১টি পেশা দক্ষ কর্মীর তালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ পড়েছে। এছাড়া, কেয়ার ওয়ার্কার (সামাজিক সেবা খাত) ভিসায় আসা কর্মীদের জন্য ডিপেন্ডেন্ট বা পরিবার নিয়ে আসার সুবিধা আগেই বন্ধ করা হয়েছিল এবং এই খাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের স্পনসরশিপ খরচ ও তদারকি বৃদ্ধি
যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলোর জন্য বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত ‘ইমিগ্রেশন স্কিলস চার্জ’ (ISC) প্রায় ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বড় স্পনসরদের জন্য প্রতি বছর কর্মীপ্রতি ১,৩২০ পাউন্ড এবং ছোট বা চ্যারিটেবল প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪৮০ পাউন্ড ফি দিতে হচ্ছে। ভিসা এবং হেলথ সারচার্জসহ ৫ বছরের জন্য একজন বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে নিয়োগকর্তাদের প্রায় ১৩,৯০০ থেকে ১৪,১০০ পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।
একই সাথে ‘ইউকে ভিসাস অ্যান্ড ইমিগ্রেশন’ (UKVI) বেতন সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন থেকে প্রতি পে-পিরিয়ডে (মাসিক বা চুক্তিভিত্তিক নির্দিষ্ট সময়ে) কর্মীকে পুরো বেতন পরিশোধের ডিজিটাল প্রমাণ দেখাতে হবে, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান কাগজ-কলমে বেশি বেতন দেখিয়ে বাস্তবে কম দিতে না পারে।
শিক্ষার্থীদের ওপর বিধিনিষেধ ও গ্র্যাজুয়েট ভিসার মেয়াদ হ্রাস
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও যুক্তরাজ্য প্রশাসন কড়া অবস্থান নিয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নিয়ম অনুযায়ী, পড়াশোনা শেষে কাজের জন্য নির্ধারিত ‘গ্র্যাজুয়েট ভিসা’ (Post-Study Work Visa)-র মেয়াদ ২ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ মাস (দেড় বছর) করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এর ফলে বিদেশি ডিগ্রিধারীদের জন্য পড়াশোনা শেষে স্থায়ী চাকরি খোঁজার বা দক্ষ কর্মী ভিসায় রূপান্তর করার সময়সীমা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে আসছে।
তাছাড়া, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন আবেদনকারীদের জন্য ইংরেজি ভাষার দক্ষতার স্তর ‘B1’ (জিসিএসই লেভেল) থেকে বাড়িয়ে ‘B2’ (এ-লেভেল স্ট্যান্ডার্ড) করা হয়েছে। ফলে ইংরেজি ভাষায় উচ্চতর দক্ষতা প্রমাণ না করতে পারলে চাকরি বা উচ্চশিক্ষার ভিসা পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থায়ী বসবাসের (ILR) পথ দীর্ঘ করার প্রস্তাব
যুক্তরাজ্যে যারা স্থায়ীভাবে বসবাসের (Indefinite Leave to Remain – ILR) স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্যও দুঃসংবাদ রয়েছে। সরকার বর্তমানে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতার মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার একটি নতুন ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ (Earned Settlement) ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে কাজ করছে। একই সাথে ২০২৭ সালের মার্চ থেকে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের জন্য ইংরেজি ভাষার প্রয়োজনীয় দক্ষতা B2 লেভেল করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের এই ধারাবাহিক কঠোর নীতিমালার কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য ব্রিটেনে যাওয়া এবং সেখানে স্থায়ী হওয়া এখন আগের চেয়ে বহুগুণ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।