বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: ২০২৬ সালের জুন মাসের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং নীতিগত পরিবর্তনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং খাতের শেয়ার এখন একটি বড় ধরনের কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজেট-পরবর্তী ইতিবাচক অনুষঙ্গ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকির কারণে এই খাতে মিশ্র প্রবণতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের স্পষ্ট আভাস মিলছে।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ পথরেখাকে কয়েকটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব:
১. লভ্যাংশ ব্যর্থতা ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির ধাক্কা
চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ঝাঁকুনি আসে যখন লভ্যাংশ (Dividend) দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন করে ১০টি ব্যাংককে ‘জেড’ বা ‘জাঙ্ক’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ (১৫টি ব্যাংক) এখন সর্বনিম্ন ট্রেডিং ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন ঘাটতি (Provision Shortfall) থাকার কারণেই ব্যাংকগুলো লভ্যাংশ দিতে পারেনি, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছিল।
২. নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি ও সুশাসনের চেষ্টা
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসি (BSEC) কর্তৃক সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ঋণ বিতরণে অনিয়ম ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর স্ক্রুটিনির কারণে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্বলতাগুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে। এটি সাময়িকভাবে শেয়ারের মূল্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও, দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য এটিকে ইতিবাচক সংস্কার হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
৩. বাজেট-পরবর্তী ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস ও ব্লু-চিপের চাহিদা
অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজার-বান্ধব কিছু নীতি এবং নতুন বিএসইসি কমিশনের ওপর ভরসা রেখে জুনের মাঝামাঝি সময়ে ডিএসই (DSE) সূচক আবার ৫,৬০০ পয়েন্টের কোটা পার করেছে। বিশেষ করে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন (Blue-chip) এবং যেসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী, সেগুলোর শেয়ারের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বাড়ছে। আকর্ষণীয় মূল্যে নেমে আসা ভালো ব্যাংকের শেয়ারগুলো এখন অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য পোর্টফোলিওতে যুক্ত করছেন।
৪. ইসলামী ব্যাংক ও বড় মূলধনী শেয়ারের চমক
সম্প্রতি কিছু বড় মূলধনী ব্যাংকের (যেমন ইসলামী ব্যাংক) পর্ষদ পুনর্গঠন এবং তারল্য সংকট কাটানোর জন্য সরকারি ও নীতিগত সহায়তার আশ্বাসে বাজারে আকস্মিক বড় উত্থান দেখা গেছে। এই ধরনের সিলেক্টিভ বা সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের শেয়ারের দাম সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ সীমায় স্পর্শ করার ঘটনা সূচককে টেনে তুলতে বড় ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যৎ পথরেখা ও বিনিয়োগকারীদের করণীয়: সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্যাংকিং খাতের শেয়ার এখন আর ঢালাওভাবে বা অন্ধভাবে কেনার সুযোগ নেই। বাজার এখন স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত—একদিকে রয়েছে প্রভিশন ঘাটতি ও তারল্য সংকটে পড়া দুর্বল ব্যাংক, অন্যদিকে রয়েছে সুশাসন ও ভালো ডিভিডেন্ড হিস্ট্রি বজায় রাখা শক্তিশালী ব্যাংক। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার, প্রভিশন সক্ষমতা এবং পর্ষদের কাঠামোগত স্বচ্ছতা যাচাই করা অপরিহার্য।