জামশেদ উদ্দীন, সীতাকুণ্ড: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল একসময় পরিচিত ছিল লোহার ঠনঠন শব্দ, কাদা-মাখা সৈকত আর অনিরাপদ জাহাজ কাটার দৃশ্যপটের জন্য। কিন্তু হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন (Hong Kong Convention – HKC) কার্যকর হওয়ার পর সেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। অস্তিত্ব রক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙ্গা শিল্পে এখন চলছে এক নীরব ‘সবুজ বিপ্লব’।
ইতিমধ্যেই দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ইয়ার্ড হংকং কনভেনশনের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করে সনদ (HKC Compliance) অর্জন করেছে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে দেখা দিয়েছে সংকট-যেসকল ইয়ার্ড এখনো এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে আছে, তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জাহাজ কেনার প্রতিযোগিতায় ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।
সনদপ্রাপ্তদের রমরমা, অন্যদের ভাটা
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববাজারে জাহাজের মালিকরা এখন অনেক বেশি সচেতন। ইউরোপ, জাপান বা উন্নত বিশ্বের বড় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ বিক্রির ক্ষেত্রে এখন আর শুধু সর্বোচ্চ দাম দেখে না, বরং জাহাজটি পরিবেশসম্মতভাবে কাটা হবে কি না, তা নিশ্চিত হতে চায়।
ফলে, সীতাকুণ্ডের যেসব ইয়ার্ড হংকং কনভেনশনের সনদ পেয়েছে, তারা সহজেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ভালো মানের জাহাজ আমদানি করতে পারছে। অন্যদিকে, সনাতন পদ্ধতির ইয়ার্ডগুলো আন্তর্জাতিক টেন্ডারে অংশ নিয়েও জাহাজ পাচ্ছে না। অনেক বিদেশি বিক্রেতা ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ বা সনদহীন ইয়ার্ডে জাহাজ বিক্রি করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
রূপান্তরের চাপ ও বাস্তবতা
সরেজমিনে দেখা গেছে, সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডগুলোতে এখন আর বালুর ওপর জাহাজ কাটা হয় না। সেখানে তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের নিশ্ছিদ্র চত্বর বা ইম্পারমিয়াবল ফ্লোর। ক্ষতিকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে আধুনিক ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের পরনে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা সরঞ্জাম।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BSBRA) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বেশ কিছু ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মান অর্জনের প্রক্রিয়ায় বা ‘পাইপলাইনে’ রয়েছে। তবে এই রূপান্তর অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি বসাতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যা ছোট ও মাঝারি ইয়ার্ডগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অস্তিত্বের সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর জাহাজভাঙ্গা শিল্পে এখন ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ নীতি চলছে। যারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের ইয়ার্ডকে ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তর করতে পারবে না, তারা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
সীতাকুণ্ডের একজন ইয়ার্ড মালিক বলেন, “আগে আমরা সহজেই জাহাজ কিনতাম। এখন সনদ না থাকলে কেউ জাহাজ দিতে চায় না। ব্যবসার স্বার্থেই আমাদের পরিবেশবান্ধব হতে হচ্ছে। এটি এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং বাধ্যবাধকতা।”
আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের জাহাজভাঙ্গা শিল্পকে বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিতে হলে শতভাগ ইয়ার্ডকে হংকং কনভেনশনের আওতায় আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










