Home First Lead বাজেট: ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ডলাইন প্রকল্প, কমবে ৮০ কিমি দূরত্ব

বাজেট: ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ডলাইন প্রকল্প, কমবে ৮০ কিমি দূরত্ব

দেশের প্রধান বাণিজ্যিক করিডোরে যুগান্তকারী বিপ্লবের অপেক্ষা
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে দেশের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে একটি মেগা পরিকল্পনার ঘোষণা এসেছে। প্রস্তাবিত রেল বাজেটে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি ‘কর্ডলাইন’ (সংক্ষিপ্ত রেলপথ) নির্মাণের মাধ্যমে দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারের এই মাস্টারপ্ল্যান চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ, আমদানিকারক ও লজিস্টিকস খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক করিডোরে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে সময় এবং খরচ দুই-ই নাটকীয়ভাবে কমে আসবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক নতুন গতি আনবে।
কেন এই কর্ডলাইন এতটা জরুরি? বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রেললাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২১ কিলোমিটার। ট্রেনগুলোকে ঢাকা থেকে ছেড়ে টঙ্গী, ভৈরববাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়া হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে হয়। ব্রিটিশ আমলের এই ঘুরতি পথের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে যাতায়াতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা এবং মালবাহী ট্রেনের ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি সময় লেগে যায়।
বাজেটে প্রস্তাবিত নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত সরাসরি কর্ডলাইন নির্মাণ করা হবে। এর ফলে বর্তমান রুট থেকে দূরত্ব একলাফে প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে আসবে। সরাসরি এই সংযোগের ফলে ঢাকা-চট্টগ্রামের রেল দূরত্ব দাঁড়াবে প্রায় ২৪১ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা।
পণ্য পরিবহন খরচ ও সময়ে বড় সাশ্রয়
চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক শিল্প, ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক এবং ভারী শিল্পের উদ্যোক্তারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একে দেশের লজিস্টিকস খাতের ‘গেম চেইঞ্জার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
১. পণ্য খালাসে গতি ও লিড-টাইম হ্রাস: চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের সিংহভাগ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে কর্ডলাইন চালু হলে বন্দর থেকে দ্রুততম সময়ে কাঁচামাল ঢাকার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এবং ঢাকার তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য চট্টগ্রামে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম শর্ত ‘লিড-টাইম’ (পণ্য তৈরির সময়সীমা) অনেক কমে আসবে।
২. সড়কপথের ওপর চাপ ও খরচ হ্রাস: বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর দেশের পণ্য পরিবহনের বড় অংশ নির্ভরশীল। মহাসড়কে প্রায়ই যানজট ও অতিরিক্ত টোল-ভাড়ার কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। কর্ডলাইন চালু হলে রেলের মাধ্যমে কম খরচে এবং নিরাপদ উপায়ে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার পরিবহন করা যাবে। এতে মহাসড়কের ওপর থেকে চাপ কমবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবেশ দূষণ দুই-ই হ্রাস পাবে।
৩. জ্বালানি সাশ্রয় ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস: দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে জাতীয় জ্বালানি খাতের ওপর। ট্রেনগুলোর যাতায়াতের সময় কমে আসায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সাশ্রয় হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
বাস্তবায়ন ও অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ
প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকলেও, এর দ্রুত ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী চেম্বার ও উন্নয়ন গবেষকদের মতে, অতীতে অনেক বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ এবং অর্থায়নের জটিলতায় সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ডলাইনের মতো মেগা প্রকল্প যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে এবং বাজেট বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সেদিকে সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। একই সাথে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনালের সাথে এই কর্ডলাইনের সমন্বিত সংযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দূরত্ব কমিয়ে আনার এই রেল পরিকল্পনা শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ধমনীকে সচল করার মহাপরিকল্পনা। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকার শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি হবে, যা আগামী দিনে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
Visit www.businesstoday24.com