খুলে গেল হরমুজ প্রণালী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ইতিহাসে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও নাটকীয় মোড় দেখা গেল মধ্যপ্রাচ্যে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল আলোচিত শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে এই ঐতিহাসিক সমঝোতা সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেন।
একই সঙ্গে তিনি বিশ্ব অর্থনীতির ফুসফুস খ্যাত ‘হরমুজ প্রণালী’ বিশ্বের সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করার বার্তা দিয়েছেন এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ জারি করেছেন।
ট্রাম্পের ঘোষণা: “ইঞ্জিন চালু করো, তেল প্রবাহিত হতে দাও”
সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বিশ্ববাসীকে অভিনন্দন জানান। তিনি তাঁর পোস্টে লেখেন:
“ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সবাইকে অভিনন্দন! আমি আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালীতে সম্পূর্ণ অবাধ ও টোল-মুক্ত চলাচলের অনুমোদন দিচ্ছি। একই সঙ্গে মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলো।”
বিশ্বের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর উদ্দেশ্যে ট্রাম্প আরও বলেন, “বিশ্বের সমস্ত জাহাজ, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হতে দাও!”
মধ্যস্থতাকারী দেশ ও চুক্তির প্রেক্ষাপট
১০-দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান এবং কাতার। এছাড়া সৌদি আরব ও তুরস্কও এই শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তেহরানে কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে টানা ১৭ ঘণ্টার নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনার পর এই সমঝোতার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হতে যাচ্ছে।
চুক্তির প্রধান শর্ত ও গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী এবং পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইরান শুরু থেকেই লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধের যে শর্ত দিয়ে আসছিল, তা এই চুক্তিতে গুরুত্ব পেয়েছে।
নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে কঠোর নৌ অবরোধ দিয়ে রেখেছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে তুলে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ইরান যাতে বিশ্ববাজারে তেল বিক্রি করে তাদের অর্থনীতি সচল করতে পারে, সেজন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে।
হরমুজ প্রণালী পুনর্উন্মুক্তকরণ: যুদ্ধের শুরুতে ইরান হরমুজ প্রণালীতে যে মাইন স্থাপন করেছিল, তা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে অপসারণ করে নৌপথটি সম্পূর্ণ নিরাপদ করা হবে। এই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ইরান কোনো জাহাজ থেকে টোল বা শুল্ক আদায় করবে না।
পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গ: ইরান পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। ইরানের মজুত থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তত্ত্বাবধানে অন-সাইট নিষ্ক্রিয় বা ডিলিউট করা হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির হাওয়া
বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) পরিবাহিত হয় এই সরু হরমুজ প্রণালী দিয়ে। গত তিন মাস ধরে যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে এই পথটি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই আকস্মিক সমঝোতার খবর আসার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই চুক্তির ফলে বিশ্ববাজারের দীর্ঘদিনের অস্থিরতা দূর হবে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
নিউজ আপডেট ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের নিয়মিত তথ্য পেতে businesstoday24.com-এর সঙ্গেই থাকুন।