কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২৮ বছর পর ফের কি পুরনো দলেই ফিরতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর গতিপ্রকৃতি এবং রাজনৈতিক সূত্রের খবরকে কেন্দ্র করে এই জল্পনা এখন তুঙ্গে উঠেছে।
রাজনৈতিক অলিন্দের গুঞ্জন, সম্প্রতি কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি অত্যন্ত গোপন ও একান্ত বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জাতীয় কংগ্রেসে ফিরিয়ে এনে দলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, তৃণমূলের অখিল ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও জাতীয় রাজনীতিতে বড় দায়িত্বে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রাহুল গান্ধী স্বয়ং অভিষেককে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পদের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি।
কেন এই আকস্মিক পদক্ষেপ?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই চরম সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ তীব্র সংকট। বর্তমানে তৃণমূলের অন্দরে ক্রমবর্ধমান অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং বড়সড় ভাঙন রুখতেই এই কৌশল নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, তৃণমূলের একটি প্রভাবশালী অংশ, যার মধ্যে লোকসভা ও বিধানসভার বেশ কয়েকজন বিধায়ক ও সাংসদ রয়েছেন, তারা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা একটি ব্লক তৈরির পরিকল্পনা করছেন। এমনকি তারা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে দলের প্রতীক ও দলীয় তহবিল দখলের আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাব্য মহাসংকট ও রাজনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের কংগ্রেসের ছত্রছায়ায় ফেরার সুরক্ষিত পথ বেছে নিচ্ছেন কি না, তা নিয়ে দেশজুড়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
রাজ্য কংগ্রেসে চরম অস্বস্তি ও ক্ষোভ
দিল্লির হাইকমান্ডের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপে তীব্র অস্বস্তি ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের অন্দরে। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা রাজ্য কংগ্রেসের একাংশ ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তির সুর চড়িয়েছে। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতাদের দলে নেওয়ার বিষয়ে তারা কোনোভাবেই সহমত নন।
এই বিষয়ে ধোঁয়াশা বজায় রেখে মুখ খুলেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে জানান, “রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প। তবে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব ও মতাদর্শ মেনে যারা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আসতে চান, তাদের আমরা স্বাগত জানাব। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্তদের জন্য কংগ্রেসে কোনো জায়গা নেই।” শুভঙ্কর সরকারের এই মন্তব্য একদিকে যেমন জোট বা সংযুক্তির পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঠিক তেমনই দলের ভেতরের ক্ষোভকেও মান্যতা দিচ্ছে।
বিজেপির তীব্র কটাক্ষ
এই জল্পনা সামনে আসতেই তৃণমূল ও কংগ্রেসকে একযোগে আক্রমণ করতে ছাড়েনি বিরোধী শিবির। বিজেপির কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এই সম্ভাব্য দলবদলকে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি আবার কংগ্রেসে ফিরে যান, তবে ‘পুনঃ মুষিক ভব’ (আবার ইঁদুর হও) প্রবাদটিই সত্য হবে। নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে তিনি এখন সব করতে পারেন।”
বিভ্রান্তিতে কর্মী-সমর্থকেরা
তৃণমূল সুপ্রিমোর এই সম্ভাব্য রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনকে ঘিরে দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে যেমন তৎপরতা তুঙ্গে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গসহ দেশজুড়ে তৃণমূল ও কংগ্রেস—উভয় শিবিরের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের একাংশ যেখানে এই খবরে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, সেখানে কংগ্রেস কর্মীরাও ধন্দে পড়েছেন যে আগামী দিনে রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অভিমুখ কী হবে। এখন দেখার, সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়।
এই ধরনের আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্রেকিং খবরের আপডেট পেতে নিয়মিত businesstoday24.com ফলো করুন এবং এই বিষয়ে আপনার মূল্যবান মতামত নিচে মন্তব্য করে আমাদের জানান।