বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চাঁদাবাজি, জমি দখল, পাহাড় কাটা এবং অস্ত্রের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ৩ হাজার ১০০ একরের এই খাসভূমি এখন পরিবর্তনের মুখে।
সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বিত অভিযান এবং সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর দীর্ঘদিনের অপরাধ সাম্রাজ্য নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এলাকায় বসেছে আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্প, শুরু হয়েছে সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকার এই দুর্ভেদ্য অঞ্চলকে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে বদ্ধপরিকর।
তবে এই দৃশ্যমান স্বস্তির আড়ালে রয়ে গেছে এক গভীর উদ্বেগ। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কেবল মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসী ইয়াসিন কিংবা রোকনকে তাড়িয়ে বা গ্রেফতার করে জঙ্গল সলিমপুরের স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা অসম্ভব। বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে যে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, তার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন। নেপথ্যের এই গডফাদাররা বরাবরই থেকে গেছেন ছায়ার আড়ালে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে এবং সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইয়াসিন ও রোকন বাহিনী সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালাত। স্থানীয়দের ভাষায়, জঙ্গল সলিমপুরে দলিলের চেয়ে বেশি মূল্য ছিল সন্ত্রাসীদের কথার। যার শক্তি বেশি, জমির মালিকও যেন সে-ই। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বলয় ছাড়া এই বিপুল অপরাধযজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রশাসনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, ড্রোনের নজরদারি এড়ানো কিংবা শত শত অবৈধ প্লট বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকা পাচারের নেপথ্যে কাজ করেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে র্যাবের ওপর হামলা এবং গত ২৪ মে নির্মাণাধীন র্যাব ক্যাম্পে শত শত সন্ত্রাসী নিয়ে পুনরায় হামলা চালানোর দুঃসাহস প্রমাণ করে, এই বাহিনীর পেছনে এখনও কোনো অদৃশ্য শক্তির আশকারা রয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকা ছেড়ে পালালেও তাদের অর্থের উৎস এবং রাজনৈতিক আশ্রয়দাতারা এখনও অক্ষত।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, বায়েজিদ লিংক রোড থেকে আলীনগর, আলীনগর থেকে উত্তরে হাটহাজারী লিংক রোড এবং জলিল টেক্সটাইল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। অনেকেই ইয়াসিনের কাছ থেকে প্লট কিনে বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে কিছু আশঙ্কা রয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সরকার কাউকে উচ্ছেদ করতে আসেনি। উন্নয়নের প্রয়োজনে কোথাও জমি প্রয়োজন হলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেই কাজ করা হবে। জঙ্গল সলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আর সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালাতে দেওয়া হবে না। যারা বছরের পর বছর মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকার নিরপরাধ ও অসহায় মানুষের জন্য কাজ করছে। সলিমপুরে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলাকার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করছে সরকার।
বিশ্লেষকদের হুঁশিয়ারি
যদি কেবল দৃশ্যমান অপরাধীদের নির্মূল করে ক্ষান্ত হওয়া হয় এবং নেপথ্যের মূল কুশীলব ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা না যায়, তবে জঙ্গল সলিমপুরের এই শান্ত পরিস্থিতি সাময়িক রূপ নেবে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাহাড়ে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বৈধ আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনাই অনেক সময় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংগ্রহের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। ক্ষমতার পালাবদল কিংবা সুযোগ বুঝে পুরোনো গডফাদারদের হাত ধরেই তৈরি হবে নতুন কোনো ইয়াসিন কিংবা নতুন কোনো রোকন।
অবৈধ জমি বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অর্থনৈতিক কাঠামোটি পুরোপুরি ভেঙে দিতে নেপথ্যের মূল চক্রকে চিহ্নিত করে উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।










