বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে বিস্তৃত জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলো আজ এক জীবন্ত মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। উচ্চতা থেকে শত শত টন ওজনের ভারী লোহার পাত খসে পড়া, রাসায়নিক ট্যাঙ্কে জমাট বিষাক্ত গ্যাসের বিস্ফোরণ, হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া আগুনের লেলিহান শিখা এবং অ্যাসবেস্টস ও সিসার মতো প্রাণঘাতী রাসায়নিকের বিস্তার—সব মিলিয়ে এটি দেশের তো বটেই, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ খাত। অথচ এই চরম বিপজ্জনক কর্মপরিবেশে কোনো ধরনের কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন প্রভাবশালী ইয়ার্ড মালিকেরা। বিপরীতে, তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলোর চরম দায়িত্বহীনতা ও রহস্যজনক নীরবতা এই রক্তক্ষয়ী অব্যবস্থাপনাকে যেন স্থায়ী রূপ দিয়েছে।
ইয়ার্ডগুলোর অভ্যন্তরীণ চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিরাপত্তাবিধি না মানার এক বেপরোয়া সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন মালিকেরা। আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং জাতীয় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ নীতিমালা অনুযায়ী কাটিং কাজ শুরুর আগে জাহাজকে শতভাগ ‘গ্যাস-মুক্ত’ করার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। দায়সারা বা ভুয়া সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে রাতের আঁধারে বা দ্রুত কাজ শেষ করার লোভে গ্যাস সিলিন্ডার ও টর্চ কাটিং শুরু করে দেওয়া হয়। যার অনিবার্য পরিণতি বিষাক্ত গ্যাসের বিকট বিস্ফোরণ এবং দগ্ধ হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু।
বহুতল ভবনের সমান উঁচু জাহাজের ডেক থেকে ভারী স্ক্র্যাপ নিচে ফেলার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেল্ট, হেলমেট বা আধুনিক হাইড্রোলিক ক্রেন ব্যবহারের বদলে আদিম কায়দায় শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হয়। মালিকদের কাছে শ্রমিকের জীবনের চেয়ে স্ক্র্যাপ লোহার বাজারমূল্য যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর গঠিত লোকদেখানো তদন্ত কমিটি ও সামান্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছুড়ে দেওয়ার প্রবণতাই তার বড় প্রমাণ।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি মালিকপক্ষের চরম অপরাধমূলক অবহেলার আরেকটি দিক। পুরনো যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাঙ্কারে থাকা মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু, পিভিসি এবং ক্ষতিকর তেলমিশ্রিত বর্জ্য কোনো প্রকার ফিল্টারিং ছাড়া সরাসরি মিশছে বঙ্গোপসাগরের সৈকতে। এসব বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক কণার সংস্পর্শে এসে শত শত শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যান্সার, হাঁপানি ও স্নায়বিক বৈকল্যের শিকার হচ্ছেন।
মালিকেরা তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা তো দূরে থাক, ন্যুনতম গ্লাভস ও আধুনিক রেসপিরেটরি মাস্ক সরবরাহেও কৃপণতা প্রদর্শন করেন। চিকিৎসার ব্যয় বহন না করে অসুস্থ বা পঙ্গু শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতার পেছনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ব্যর্থতা ও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত ও কঠোর তদারকি করার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সরব হন, কিছু শোকবার্তা আর নোটিশ জারির মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মালিকদের সাথে অসাধু কর্মকর্তাদের আঁতাতের কারণেই আজ পর্যন্ত বিপজ্জনক ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা বা লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক চাপে কাগজ-কলমে কিছু ‘গ্রিন ইয়ার্ড’-এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পুরো খাতের সামগ্রিক রক্তক্ষরণ আড়াল করার এই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা চরম লজ্জাজনক।
একটি উন্নয়নশীল দেশের ইস্পাত ও কাঁচামালের যোগানদাতা হিসেবে এই শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু কোনো দেশের উন্নয়ন শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে হতে পারে না। জাহাজভাঙা শিল্পকে আধুনিক ও টেকসই করতে হলে প্রথমত মালিকদের জবাবদিহিতা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে এবং শ্রমিক হত্যা সমতুল্য অবহেলার জন্য ফৌজদারি আইনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনকে তাদের নজরদারি ব্যবস্থা ডিজিটালাইজড ও কঠোর করে ইয়ার্ডের নিরাপত্তা মান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে এই উপকূলীয় ইয়ার্ডগুলো শ্রমিকের জীবিকার স্থান না হয়ে বরাবরের মতোই থাকবে তাদের অপমৃত্যুর ফাঁদ।