Home Second Lead ঠকবাজির হাট: মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সুদের মরণফাঁদ

ঠকবাজির হাট: মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সুদের মরণফাঁদ

শামসুল ইসলাম, ঢাকা: স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপন—’কাগজপত্র ছাড়াই মাত্র ৫ মিনিটে ঋণ’। বিপদে পড়ে বা শখের বশে সেই অ্যাপ নামিয়ে ঋণের আবেদন করলেই শুরু হয় এক ভয়ংকর প্রতারণার জাল। সাধারণ মানুষের অভাব আর জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত টাকা পাওয়ার ইচ্ছাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে এই ‘ডিজিটাল সুদের ব্যবসা’, যা এখন অনেকের জীবনের বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেভাবে ছড়ানো হয় এই জাল
এই প্রতারক চক্র সাধারণত ফেসবুক বা ইউটিউবে চটকদার বিজ্ঞাপন দেয়। ঋণ পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রাহককে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ ইনস্টল করতে বলা হয়। অ্যাপটি ইনস্টল করার সময় কৌশলে গ্রাহকের ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট, গ্যালারি এবং ব্যক্তিগত মেসেজ দেখার অনুমতি (Permission) হাতিয়ে নেয় তারা। একবার এই তথ্যগুলো তাদের সার্ভারে চলে গেলে গ্রাহক কার্যত তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।
উচ্চহারের সুদ ও লুকানো শর্ত
বলা হয় সামান্য সুদে ঋণ দেওয়া হবে, কিন্তু বাস্তবে এই সুদের হার বার্ষিক ১০০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। যেমন—৫ হাজার টাকা ঋণ নিলে দেখা যায় গ্রাহকের হাতে আসে মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টাকা। বাকি ১ হাজার ৫০০ টাকা ‘প্রসেসিং ফি’ হিসেবে কেটে রাখা হয়। অথচ মাত্র সাত দিন পরই গ্রাহককে পুরো ৫ হাজার টাকাই পরিশোধ করতে বলা হয়। যারা সময়মতো টাকা দিতে পারেন না, তাদের ওপর শুরু হয় ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক নির্যাতন।
ব্ল্যাকমেইল ও সামাজিক হয়রানি
টাকা আদায়ে এই অ্যাপ কর্তৃপক্ষ কোনো আইনগত ব্যবস্থার ধার ধারে না; বরং তারা বেছে নেয় ব্ল্যাকমেইলের পথ। ঋণের কিস্তি দিতে এক-দুদিন দেরি হলেই গ্রাহকের ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে থাকা আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের ফোন করে আপত্তিকর কথা বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ছবি এডিট করে বিকৃত বা অশ্লীল বানিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে আরও উচ্চ সুদে অন্য অ্যাপ থেকে ঋণ নিয়ে আগের ঋণ শোধ করার চেষ্টা করেন এবং এক অন্তহীন ঋণের চক্রে জড়িয়ে পড়েন।
বাঁচার উপায় ও সতর্কতা
অপরিচিত অ্যাপ বর্জন: গুগল প্লে-স্টোর বা অ্যাপ স্টোরে পাওয়া গেলেই সেটি নিরাপদ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনহীন কোনো অ্যাপ থেকে ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলুন।
পারমিশন চেক: যেকোনো অ্যাপ ইনস্টল করার সময় কেন তারা আপনার গ্যালারি বা কন্টাক্ট লিস্টের এক্সেস চাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন। অপ্রয়োজনীয় পারমিশন দেবেন না।
লুকানো খরচ জানুন: ঋণের আগে প্রসেসিং ফি এবং প্রকৃত সুদের হার সম্পর্কে নিশ্চিত হোন।
আইনি ব্যবস্থা: যদি কোনো অ্যাপ আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে, তবে ভয় না পেয়ে দ্রুত নিকটস্থ থানা অথবা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানান। মনে রাখবেন, গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে হয়রানি করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
ডিজিটাল এই ঠকবাজি থেকে বাঁচতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আপনার একটি অসতর্ক ক্লিক কেড়ে নিতে পারে আপনার জীবনের শান্তি ও সম্মান।
ফলো করুন: www.businesstoday24.com