ছাপানো কাগজ এখন কেবল ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’
মোস্তফা তারেক, নিউ ইয়র্ক:
দশকে শত শত স্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে এবং বড় দৈনিকগুলো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বেছে নিয়েছে ডিজিটাল পথ। এই রূপান্তরের সার্থক রূপকার হিসেবে বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ (NYT)-এর নাম। প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান বলছে, তাদের ব্যবসার মূল শক্তি এখন আর ছাপানো কাগজ নয়, বরং স্মার্টফোনের স্ক্রিন।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস: ডিজিটাল সাফল্যের মডেল
২০২০ সালের পর থেকে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মোড় আসে। বর্তমানে তাদের মোট গ্রাহক সংখ্যা বা সাবস্ক্রিপশন ১২ মিলিয়নেরও (১ কোটি ২০ লক্ষ) বেশি। মজার বিষয় হলো, এই বিশাল গ্রাহকবাহিনীর মধ্যে ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ কেবল ডিজিটাল সংস্করণের জন্য অর্থ প্রদান করেন।
পরিসংখ্যান এক নজরে:
- মোট গ্রাহক: ১২.৮ মিলিয়ন (প্রায়)।
- ডিজিটাল-অনলি গ্রাহক: ১০.৫ মিলিয়ন+।
- প্রিন্ট গ্রাহক: ৭ লক্ষের নিচে (যা ক্রমাগত কমছে)।
- আয়ের উৎস: বর্তমানে তাদের মোট রাজস্বের সিংহভাগই আসে ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে।
কেন প্রিন্ট সংস্করণ এখন ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’?
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রিন্ট এডিশন বা ছাপানো কাগজ এখন অনেকটা ‘লাক্সারি আইটেম’ বা ‘ব্র্যান্ড আইকন’ হিসেবে কাজ করছে। এর কারণগুলো হলো:
পার্থক্য তৈরি করা: ডিজিটাল দুনিয়ায় হাজারো সংবাদের ভিড়ে একটি ছাপানো কপি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
বিজ্ঞাপনের উচ্চমূল্য: ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের তুলনায় প্রিন্ট সংস্করণে পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপনের দাম এখনও অনেক বেশি, যা ব্র্যান্ডগুলোর কাছে আভিজাত্যের লড়াই।
প্রবীণ ও সংগ্রাহক পাঠক: একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির পাঠক এবং লাইব্রেরিগুলোর কাছে এখনও মুদ্রিত কাগজের আবেদন রয়েছে, যা ব্র্যান্ডের দৃশ্যমানতা বজায় রাখে।
পুরো মার্কিন বাজারের চিত্র
নিউ ইয়র্ক টাইমস সফল হলেও অনেক আঞ্চলিক পত্রিকা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ সালের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মোট সংবাদপত্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে।
গ্যানেট (Gannett): আমেরিকার বৃহত্তম এই সংবাদপত্র চেইন তাদের অনেক দৈনিকের প্রিন্ট সংস্করণ কমিয়ে সপ্তাহে মাত্র কয়েকদিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ডিজিটাল ফার্স্ট পলিসি: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্টের মতো বড় নামগুলো এখন সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘ডিজিটাল ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ, সংবাদ আগে অনলাইনে প্রকাশ পায়, পরে তা কাগজে ছাপা হয়।
রূপান্তরের নতুন কৌশল: শুধু খবর নয়, জীবনযাপন
নিউ ইয়র্ক টাইমস কেবল সংবাদ বিক্রি করে এই সাফল্য পায়নি। তারা তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গেমস (যেমন- Wordle), কুকিং (Recipes) এবং প্রোডাক্ট রিভিউ (Wirecutter) অন্তর্ভুক্ত করেছে। দেখা গেছে, অনেক গ্রাহক কেবল গেম খেলার জন্য বা রান্নার রেসিপি দেখার জন্য সাবস্ক্রিপশন নিচ্ছেন, যা পরোক্ষভাবে সংবাদপত্রের ব্র্যান্ডকে শক্তিশালী করছে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রিত দৈনিক সংবাদপত্র একটি বিরল পণ্যে পরিণত হতে পারে। বড় বড় শহরগুলোতে হয়তো কেবল সাপ্তাহিক বা বিশেষ সংখ্যা হিসেবে কাগজ ছাপা হবে, আর খবরের মূল জগৎ হবে সম্পূর্ণ অনলাইন এবং অ্যাপ-ভিত্তিক।
বৈশ্বিক গণমাধ্যমের এমন রূপান্তর ও ব্যবসায়িক খবরের আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন