ফ্ল্যাগ অফ কনভিনিয়েন্সের আড়ালে অরাজকতা: দায় এড়াচ্ছেন জাহাজ মালিকরা
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: বিশ্বজুড়ে শিপিং বা নৌ-বাণিজ্য যখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর কথা বলছে, ঠিক তখনই অন্ধকার এক চিত্র সামনে আনলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন (ITF) এবং মেরিন ইনসাইটের (Marine Insight) মতে ২০২৫ সালটি ছিল নাবিকদের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বছর।
রেকর্ড সংখ্যক নাবিক পরিত্যক্ত
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ৬,২২৩ জন নাবিক ৪১০টি জাহাজে পরিত্যক্ত অবস্থায় আটকা পড়েছেন। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি। গত ছয় বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে জাহাজ পরিত্যক্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, যা বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য এক চরম অবমাননাকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ভারতীয় নাবিকদের করুণ দশা
সংবাদটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, পরিত্যক্ত নাবিকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি ভারতীয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে: ১,১২৫ জন ভারতীয় নাবিক গত বছর বিভিন্ন বন্দরে বা মাঝসমুদ্রে জাহাজসহ পরিত্যক্ত হয়েছেন।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিলিপাইন (৫৩৯ জন) এবং তৃতীয় অবস্থানে সিরিয়া (৩০৯ জন)। ভারতের মতো বৃহৎ শ্রম সরবরাহকারী দেশের নাবিকদের এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক শিপিং খাতে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
বকেয়া বেতনের পাহাড়
শুধু পরিত্যক্ত হওয়াই নয়, এই নাবিকদের কয়েক মাসের বেতনও বকেয়া পড়ে আছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে পরিত্যক্ত নাবিকদের পাওনা বেতনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও আইটিএফ (ITF) আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এর মধ্যে ১৬.৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও বিপুল পরিমাণ অর্থ এখনো অসাধু জাহাজ মালিকদের পকেটে রয়ে গেছে।
কেন এই পরিস্থিতি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত ‘ফ্ল্যাগ অফ কনভিনিয়েন্স’ (FOC) বা সুবিধাজনক পতাকাবাহী জাহাজগুলোর কারণেই এই সংকট তীব্র হচ্ছে। পরিত্যক্ত হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে ৮২ শতাংশই পানামা, লাইবেরিয়া বা মার্শাল আইল্যান্ডের মতো দেশের নিবন্ধিত। এসব দেশে জাহাজ নিবন্ধনের নিয়ম শিথিল থাকায় অসাধু মালিকরা খুব সহজেই দায়বদ্ধতা এড়িয়ে জাহাজ ও নাবিকদের ফেলে পালিয়ে যেতে পারে।
আঞ্চলিক হটস্পট
সবচেয়ে বেশি জাহাজ পরিত্যক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে তুরস্ক (৬১টি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (৫৪টি) বন্দরে। মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের কিছু বন্দরে তদারকির অভাব এই সমস্যাকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
আইএমও (IMO)-র হস্তক্ষেপের দাবি
আইটিএফ-এর সাধারণ সম্পাদক স্টিফেন কটন এই পরিস্থিতিকে “শিপিং ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি কলঙ্ক” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থা বা আইএমও-কে (IMO) আহ্বান জানিয়েছেন যাতে জাহাজ মালিকদের পরিচয় গোপন রাখা বা দায় এড়ানোর সুযোগ বন্ধে আরও কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়।
এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










