নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে বিনিয়োগকারীরা
কামরুল ইসলাম, ঢাকা: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়ালেও, দেশের পুঁজিবাজারে বইছে নিস্তব্ধতা ও গভীর উৎকণ্ঠার হাওয়া। গত দুই দশকে দফায় দফায় ধস এবং ভয়াবহ লুটপাটের শিকার হয়ে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আজ নিঃস্ব।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিনিয়োগকারীরা এখন শেষ ভরসা হিসেবে আগামী সরকারের অর্থনৈতিক রোডম্যাপের দিকে তাকিয়ে আছেন।
দুই দশকের ক্ষত: ১০ লাখ থেকে ১০ হাজারে
বিগত ২০ বছরের বাজার চিত্র বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০১০ সালের বড় ধস পরবর্তী সময়ে বাজার আর কখনো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি। বিনিয়োগকারীদের দাবি, বিএসইসি (BSEC) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বল তদারকির সুযোগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বারবার বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯-২০১০ সালে যারা ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, সঠিক নজরদারির অভাব এবং লোকসানি কোম্পানির ভিড়ে বর্তমানে অনেকের পোর্টফোলিও নামমাত্র ১০ হাজার টাকায় এসে ঠেকেছে। বিশেষ করে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-তে বিনিয়োগ করা অনেক অ্যাকাউন্টের অস্তিত্ব আজ বিলীন হওয়ার পথে।
রাজপথের হাহাকার ও বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে পাওয়া গেছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হাতাশার চিত্র:
রফিকুল ইসলাম (অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা): “পেনশনের ১০ লাখ টাকা খাটিয়েছিলাম। আজ সেখানে ১৫ হাজার টাকা আছে। ১৬ বছরে অনেক কমিশন এলো-গেলো, আমাদের পুঁজি আর ফিরলো না।”
নাসির উদ্দিন (ব্যবসায়ী): “আইসিবি-তে অ্যাকাউন্ট খুলেছিলাম ভরসা করে, এখন দেখি সেখানে বিনিয়োগের কোনো নিরাপত্তা নেই। আমরা চাই নতুন সরকার যেন লুটপাটকারীদের বিচার করে।”
পারভীন আক্তার (গৃহিণী): “ভালো কোম্পানির বদলে পচা কোম্পানির দাপট বেশি। আগামী সরকারের কাছে দাবি, আমাদের পুঁজি রক্ষার একটা গ্যারান্টি যেন অন্তত থাকে।”
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আশার আলো: ঘুরে দাঁড়ানোর শর্ত
এত নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাজার সংস্কারের একটি বড় সুযোগ হতে পারে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাজারের জন্য যা ইতিবাচক হতে পারে:
১. পেশাদার সংস্কার: নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দক্ষ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারে, তবে আস্থার সংকট দ্রুত কাটবে। ২. সুশাসনের নিশ্চয়তা: লুটপাটে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হলে বাজারে নতুন করে তারল্য প্রবাহ শুরু হবে। ৩. ভালো শেয়ারের অন্তর্ভুক্তি: বহুজাতিক ও লাভজনক সরকারি কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে এলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী আয়ের পথ খুঁজে পাবেন।
শেয়ারবাজার কেবল একটি বিনিয়োগের জায়গা নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। গত দুই দশকের লুটপাট সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়েছে। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিতের সুযোগ নিয়ে আসতে পারে। বিনিয়োগকারীরা এখন কেবল একটি আশাই করছেন—নতুন সরকার যেন বাজারের ‘সুস্থতা’ ফিরিয়ে আনে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (DSEX/DGEN) ঐতিহাসিক চিত্র (২০১০ – ২০২৬)
এই সারণিতে বছরের সমাপনী সূচক এবং বাজারের বিশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। মনে রাখবেন, ২০১৩ সালের আগে প্রধান সূচক ছিল DGEN, এরপর থেকে DSEX চালু হয়।
| বছর | সূচক (প্রায়) | বাজার পরিস্থিতি ও প্রধান ঘটনা |
| ২০১০ | ৮,৯১৮ | ঐতিহাসিক ধস: ডিসেম্বরে বাজার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে ধসে পড়ে। |
| ২০১১ | ৫,২৫৮ | ধস পরবর্তী প্রভাব: বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে রাজপথে নামেন। |
| ২০১৩ | ৪,২৬৬ | নতুন সূচক (DSEX): ডিএসইএক্স সূচক চালু হয় (২৭ জানুয়ারি)। |
| ২০১৫ | ৪,৬২৯ | স্থবিরতা: লেনদেনে মন্দা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। |
| ২০১৭ | ৬,২৪৪ | আংশিক উন্নতি: বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। |
| ২০১৯ | ৪,৪৫২ | টানা পতন: তারল্য সংকট ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতায় বড় পতন। |
| ২০২০ | ৫,৪০২ | করোনা ও ফ্লোর প্রাইস: সূচক ৩,৪০০-তে নামলে ফ্লোর প্রাইস দেওয়া হয়। |
| ২০২১ | ৭,৩৬৮ | কৃত্রিম উত্থান: কোভিড পরবর্তী সময়ে সূচক আবার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। |
| ২০২৩ | ৬,২৪৬ | লেনদেন খরা: ফ্লোর প্রাইসের কারণে মাসের পর মাস অনেক শেয়ার অচল থাকে। |
| ২০২৪ | ৫,১০০ – ৫,২০০ | রাজনৈতিক পট পরিবর্তন: তীব্র অস্থিরতা ও সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। |
| ২০২৬ (বর্তমান) | ৪,৮৬৫* | নির্বাচন পূর্ববর্তী অবস্থা: বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থাহীনতা ও সংস্কারের অপেক্ষা। |









