বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের পর বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার জলরাশিতে বাংলাদেশের যে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এবং দ্রুত বর্ধনশীল খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সামুদ্রিক শৈবাল বা সি-উইড চাষ। সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির এই নতুন উপাদানটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক শৈবালের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৩৩ বিলিয়ন টন, যার বাজার মূল্য ১১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক এই বিশাল বাজারে এখন একক আধিপত্য চীন ও ইন্দোনেশিয়ার, যারা যৌথভাবে মোট চাহিদার ৮৭ শতাংশ সরবরাহ করছে। এই আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের হিস্যা বুঝে নিতে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ এখন এক অভূতপূর্ব সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
৪০০ টন থেকে ৫ কোটি টনের লক্ষ্যমাত্রা
সাম্প্রতিক এক জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অববাহিকায় ও সমুদ্রসীমায় প্রায় ২২০ প্রজাতির অনন্য সাগর শৈবালের সন্ধান মিলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বার্ষিক শৈবাল উৎপাদনের পরিমাণ মাত্র ৪০০ টন, যার বাজার মূল্য প্রায় ৫৫ মিলিয়ন টাকা বা ৫ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু সামুদ্রিক বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় যে চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে, তা দেশের অর্থনীতিবিদদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সঠিক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি এবং উপকূলীয় অববাহিকাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই উৎপাদন ৫ কোটি টনে উন্নীত করা সম্ভব।
শিল্পখাতে বহুমুখী ব্যবহার ও আমদানির বিকল্প
সাগর শৈবালের এই বিশাল বৈচিত্র্য দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। প্রসাধন সামগ্রী, খাদ্য উপাদান, উচ্চমূল্যের ওষুধ শিল্প, পশুখাদ্য এবং মাছের ফিড তৈরিতে শৈবালের ব্যবহার বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক। এছাড়া পরিবেশবান্ধব জৈব সার (Bio-fertilizer), বায়োফুয়েল এবং প্লাস্টিকের বিকল্প পচনশীল পণ্য তৈরিতেও এটি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশীয় শিল্পে শৈবালের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ আমদানি নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত শৈবাল বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। একই সাথে, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই জলজ উদ্ভিদ দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বড় ভূমিকা রাখবে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লাখো কর্মসংস্থান ও ব্লু ইকোনমি
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অববাহিকা শৈবাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পটুয়াখালী এবং সাতক্ষীরার মতো উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে শৈবালের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব আসবে। এই জলজ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, যা ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে ৫ কোটি টনের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এখন থেকেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ‘ব্লু বন্ড’-এর মতো আধুনিক ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা এবং উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে সামুদ্রিক শৈবালের এই ৫ কোটি টনের বিশাল সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?