Home চট্টগ্রাম মানুষের টানে, কলমের শানে: সাংবাদিক স্বপন মল্লিকের নিরন্তর পথচলা

মানুষের টানে, কলমের শানে: সাংবাদিক স্বপন মল্লিকের নিরন্তর পথচলা

স্বপন মল্রিক

ফিচার প্রতিবেদন

মাহবুব হাসান, চট্টগ্রাম: সময়টা ১৯৭৯ সাল। পটিয়া সরকারি কলেজে তখন এক উত্তাল আবহাওয়া। একদিকে কলেজ সরকারিীকরণের জোরালো আন্দোলন, অন্যদিকে দীর্ঘ ২০ বছরের অচলায়তন ভেঙে প্রথমবারের মতো সরস্বতী পূজা আয়োজনের সাহসী পদক্ষেপ। এই দুই ঘটনারই সম্মুখভাগে ছিলেন একজন উদ্যমী তরুণ— স্বপন মল্লিক
সেই শুরু, এরপর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কখনও রাজপথে, কখনও আবার কলম হাতে লড়ে গেছেন সমাজ আর মানুষের জন্য।

শিকড় থেকে শিখরে

১৯৬০ সালের ২২ জুন পটিয়ার দক্ষিণ চাটরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন স্বপন মল্লিক। পিতা প্রয়াত ফণীন্দ্র লাল মল্লিকের উদার আদর্শে বড় হওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকেই ছিলেন সমাজহিতৈষী। পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুরু করে পটিয়া সরকারি কলেজ—শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি রেখে গেছেন তাঁর মেধার স্বাক্ষর।

পরবর্তীতে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করলেও তাঁর হৃদয়ে গেঁথে ছিল সাংবাদিকতার নেশা।

কলমের শক্তিতে সমাজ বদল

সত্তরের দশকের শেষভাগে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হওয়া স্বপন মল্লিকের লেখনী বরাবরই ছিল ধারালো ও তথ্যসমৃদ্ধ। ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ থেকে শুরু করে ‘দৈনিক সমকাল’—দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব গণমাধ্যমে তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।দৈনিক যায়যায়দিন ‘র আঞ্চলিক প্রকাশনা “হৃদয়ে চট্টগ্রাম” প্রতিদিন একটি পৃষ্টা প্রকাশ হতো স্বপন মল্লিকের সম্পাদনায়।চট্টগ্রামের খাল ও জলাবদ্ধতা নিয়ে  ২০০০ শব্দের সমকালে ফার্স্ট লিড প্রতিবেদন, ওষুধ নিয়ে, পানি নিয়ে অনুসন্ধানী লিড  বিশুদ্ধ পানির দুষিত বাণিজ্য ” ছিল অন্যতম সাড়া জাগানো প্রতিবেদন।  আদালত ভবনে টাকার বস্তা পাওয়ার রিপোর্টটি চট্টগ্রামে প্রথম তিনিই করেন।

বিশেষ করে ১৯৯২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু নিয়ে তাঁর করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে তাঁর ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ বিষয়ক প্রতিবেদনটি তৎকালীন জাতীয় সংসদে পর্যন্ত আলোচিত হয়। পটিয়ার আঞ্চলিক সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর বেশ কিছু প্রতিবেদন নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

একাধারে সাংবাদিক ও সংগঠক

স্বপন মল্লিক কেবল সংবাদকর্মী হিসেবেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (CUJ) থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব—সংগঠন পরিচালনায় তিনি দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা।  তিনি চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও চেয়ারম্যান ।

‘চাটগাঁ ভাষা পরিষদ’ ও ‘পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম’-এর মাধ্যমে পরিবেশ ও শেকড়ের সংস্কৃতি রক্ষায়ও তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেতুবন্ধন

পেশাগত জীবনে তিনি সান্নিধ্য পেয়েছেন দেশি-বিদেশি কিংবদন্তি সাংবাদিকদের। সিরাজুর রহমান, ইকবাল বাহার চৌধুরী কিংবা কালজয়ী সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের সাথে তাঁর সাহচর্য তাঁকে সাংবাদিকতার উচ্চমার্গে আসীন করেছে।

১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সংবর্ধনা উপলক্ষে তাঁর সম্পাদিত ‘বার্তা জীবী’র বিশেষ সংখ্যাটি আজও পাঠকমহলে সমাদৃত।

আলোর পথের যাত্রী

ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যা ও এক পুত্রের জনক স্বপন মল্লিক তাঁর সহধর্মিণী চিন্ময়ী চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় তিনি এক বটবৃক্ষ, যার ছায়াতলে বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্মের বহু কলম সৈনিক।

সততা আর সাহসিকতাই যার মূলধন, সেই স্বপন মল্লিক তাঁর কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন—সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি আজীবন সাধনার নাম। পটিয়ার মাটি ও মানুষের গল্পগুলো তিনি বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর শক্তিশালী কলমের জাদুতে।

বিজনেসটুডে২৪-এর পক্ষ থেকে গুণী এই সংবাদকর্মীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

“আইন পাস করার পর অনেক হাতছানি ছিল, কিন্তু সাংবাদিকতার সামাজিক মর্যাদা আর মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার সুযোগ আমাকে এই পেশায় বেঁধে রেখেছিল। চার দশকের এই পথচলায় মানুষের ভালোবাসাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।”

— স্বপন মল্লিক


এক নজরে স্বপন মল্লিক 

বিষয় বিবরণ
জন্মস্থান গ্রাম: চাটরা, পটিয়া, চট্টগ্রাম।
পেশা সাংবাদিক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)।
উল্লেখযোগ্য কর্মস্থল দৈনিক সমকাল, ভোরের কাগজ, জনকণ্ঠ, দৈনিক স্বাধীনতা।
বিশেষ অবদান  এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ।
সাংবাদিক নেতৃত্ব সাবেক সভাপতি/সম্পাদক, চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটি।