Home বিশেষ প্রতিবেদন বড় বাধা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার পথে শেয়ারবাজার

বড় বাধা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার পথে শেয়ারবাজার

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: ২৫ আগস্ট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে। প্রধান সূচক (ডিএসইএক্স) ৬৬ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫৫ পয়েন্টে, যা বাজারকে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে। বহুদিন ধরে বাজারের প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচিত ৫ হাজার ৪৩০ পয়েন্ট অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি সাইকোলজিক্যাল টার্নিং পয়েন্ট, যা স্বল্পমেয়াদে বাজারকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।

সোমবারের লেনদেনে দেখা যায়, মোট ৩৯৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৩৮টির শেয়ারদর বেড়েছে, ১১৪টির কমেছে এবং ৪৪টির অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে সূচকের বড় উত্থানের পরও লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,১৭৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকায়, যা আগের দিনের তুলনায় সামান্য কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি প্রমাণ করে বিনিয়োগকারীরা বিক্রির চেয়ে শেয়ার ধরে রাখার কৌশল নিয়েছেন। অর্থাৎ, বাজারে এখন ‘সেলার’ নয়, বরং ‘হোল্ডার’ বেশি, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি মুদ্রানীতি শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রভাব ফেলেছে। একদিকে সুদের হার উঁচু হওয়ায় ব্যাংক আমানতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। অন্যদিকে, শেয়ারবাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় রাখতে সরকার কিছু নীতিগত প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার ও টাকার মানের স্থিতিশীলতা পুঁজিবাজারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বাজেটে সরকার শেয়ারবাজারবান্ধব কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে—যেমন মিউচ্যুয়াল ফান্ডে কর ছাড় ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কিছু কর-সুবিধা। এর প্রভাবও বাজারে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিশ্ববাজারেও শেয়ারবাজারে একটি পুনরুদ্ধারের ধারা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমেছে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল আছে। ভারতের মতো প্রতিবেশী বাজারগুলোতেও বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আস্থা ফিরে পাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাজারও একটি ইতিবাচক তরঙ্গের অংশ হতে পারে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আমদানি ব্যয় এবং ডলারের চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে গেছে। ডলারের সরবরাহে স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় আকারে বাজারে ফিরবেন না বলেই ধারণা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অনেক সময় তথ্যভিত্তিক না হয়ে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের উপর বেশি নির্ভর করে। সূচক ৫৪৩০ পয়েন্ট অতিক্রম করায় অনেক বিনিয়োগকারী বাজারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী হয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্কও রয়েছেন—কারণ অতীতে এমন উত্থানের পর বাজার দ্রুত নিম্নমুখী হওয়ার নজির রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ মনোভাব কাজ করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দিকে নিতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আরও সক্রিয় হতে হবে। ব্যাংক, বীমা কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড যদি বড় আকারে বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে বাজারে হঠাৎ ধসের ঝুঁকি কমে আসবে। বর্তমানে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকারীরাই বাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে, যারা দ্রুত লাভ-ক্ষতির হিসাবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে বাজারে অস্থিরতা বেশি দেখা যায়।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চিত্র

সোমবার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচক বেড়েছে প্রায় ১৯১ পয়েন্ট এবং লেনদেন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এখানে ২৩৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪৬টির দর বেড়েছে, যা বাজারে সার্বিক ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিএসইর লেনদেন বৃদ্ধি মূলত মধ্যম ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তার ফল।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

আগামী দিনে বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ৫৫৬০ পয়েন্ট অতিক্রম করা। এ স্তর ভাঙতে পারলে সূচক ধীরে ধীরে ৬ হাজারের ঘরে পৌঁছাতে পারে। তবে এই পথ সহজ নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা—সবকিছুই বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

তবুও বাজার পর্যবেক্ষকরা আশাবাদী। তারা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে এবং সরকার যদি নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখে, তবে পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারবে।