বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, পটুয়াখালী: কলাপাড়া উপজেলার বালিয়াতলী ইউনিয়নের মুসুল্লীয়াবাদ গ্রাম। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সবুজে ঘেরা সাধারণ এক শান্ত পল্লী। কিন্তু বাড়ির সীমানায় পা রাখলেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। ডানা ঝাপটানোর শব্দ, ছানাদের কিচিরমিচির আর হাজারো বক ও পানকৌড়ির ধবল ডানায় আকাশ যেন মিশেছে এই আঙিনায়। এটি পূর্ব মধুখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামানের বাড়ি, যা দীর্ঘ চার দশকের মমতা আর ভালোবাসায় এখন রূপ নিয়েছে পাখিদের এক অনন্য সাম্রাজ্যে।
পাখিদের প্রতি এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি সরকারিভাবে এই বাড়িটিকে ঘোষণা করা হয়েছে ‘পাখির অভয়ারণ্য’। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ির নামফলক উন্মোচন করা হয়— ‘বিহঙ্গ বিলাস’।
স্থানীয়দের কাছে বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে ‘পাখিবাড়ি’ নামেই পরিচিত। শিক্ষক আখতারুজ্জামান ও তার পরিবারের সদস্যদের কাছে পাখিরা কোনো আগন্তুক নয়, বরং পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রায় ৪০ বছর আগে দু-একটি পাখি এসে বাসা বেঁধেছিল এই বাড়ির গাছগুলোতে। আজ সেখানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আম, তেঁতুল আর বাঁশঝাড়ের প্রতিটি ডালে এখন শুধুই পাখিদের সংসার।
সরেজমিনে দেখা যায়, সন্ধ্যা নামার আগেই দিগন্তজুড়ে সাদা মেঘের মতো ডানা মেলে দলে দলে বক আর পানকৌড়ি ফিরে আসছে তাদের ‘নীড়ে’। শিক্ষক আখতার হোসেন জানান, পাখিদের মলত্যাগের কারণে কিছুটা দুর্গন্ধ বা ঝক্কি পোহাতে হলেও মায়ার টানে সবকিছু ছাপিয়ে যায়। ঝড়ে কোনো ছানা গাছ থেকে পড়ে গেলে পরম মমতায় সেটিকে আবার বাসায় তুলে দেন পরিবারের সদস্যরা। অনেক সময় অসুস্থ পাখিকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে আকাশে উড়িয়ে দেন তারা। এমনকি ডাক দিলেই অনেক পাখি এখন মানুষের হাতের নাগালে চলে আসে। “পাখিরা আসলে সব গাছ বা সব বাড়িতে থাকে না। যেখানে নিরাপদ আশ্রয় আর ভালোবাসা পায়, সেখানেই তারা নীড় বাঁধে। আমার পরিবারের সবাই এখন এই পাখিদের অতন্দ্র প্রহরী।” — আখতার হোসেন, সহকারী প্রধান শিক্ষক।
গত বছর গণমাধ্যমে এই মানবিক ঘরবসতির খবর প্রকাশিত হলে টনক নড়ে প্রশাসনের। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক এবং এনিম্যাল লাভার্স অফ পটুয়াখালীর সদস্যদের উপস্থিতিতে বাড়িটিকে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক বলেন, “বিহঙ্গ বিলাস শুধু একটি বাড়ি নয়, এটি প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। এর ফলে এলাকার পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় কলাপাড়ার এই ‘বিহঙ্গ বিলাস’ এখন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। যেখানে প্রতিদিন সূর্য ডোবার পর সহস্র ডানার মেলা বসে আর ভোরের আলো ফুটতেই পাখিরা উড়ে যায় দূর প্রান্তরে—আবার ফিরে আসার এক বুক ভরসা নিয়ে।
এমন আরও তথ্য ও খবর পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।










