Home চট্টগ্রাম শঙ্খ মোহনা রক্ষায় প্রয়োজন ‘গ্রিন-ইঞ্জিনিয়ারিং’

শঙ্খ মোহনা রক্ষায় প্রয়োজন ‘গ্রিন-ইঞ্জিনিয়ারিং’

সুনীল অর্থনীতির নতুন দিগন্ত শঙ্খ মোহনা। গ্রিন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর চেহারা হবে এমন অপরূপ। ছবি: এ আই
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণপ্রবাহ শঙ্খ মোহনায় নাব্যতা সংকট এখন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক মরফোলজিক্যাল ডাটা ও স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মোহনার মুখে সৃষ্ট ‘সাব-মেরিন ডেল্টা’ বা ডুবো চরের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির গভীরতা ৩ মিটারের নিচে নেমে এসেছে। এই সংকট নিরসনে কেবল ড্রেজিং নয়, বরং পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও বন বিভাগের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাউবো ও বন বিভাগ: কেন সমন্বয় জরুরি?
শঙ্খ মোহনার ভৌগোলিক জটিলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি দপ্তরের একক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলগত সমাধান এবং বন বিভাগের প্রাকৃতিক সুরক্ষার মেলবন্ধন ছাড়া এই অঞ্চল রক্ষা করা অসম্ভব।
বিশেষজ্ঞ অভিমত:
১. টেকসই বাঁধ ও বনায়ন: পাউবো যখন মোহনা রক্ষায় বাঁধ বা গাইড ওয়াল নির্মাণ করে, তখন সেই মাটির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বন বিভাগের উপকূলীয় বনায়ন অপরিহার্য। কেওড়া ও বাইন গাছের শক্তিশালী শিকড় বাঁধের মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে, যা জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র জোয়ারে বাঁধ ধসে যাওয়া রোধ করে।
২. প্রাকৃতিক পলি ব্যবস্থাপনা: বন বিভাগের সৃজিত বনায়ন উপকূলীয় অঞ্চলে পানির গতিবেগ কমিয়ে দেয়। এর ফলে পলিগুলো অপরিকল্পিতভাবে চ্যানেলে না জমে একটি নির্দিষ্ট স্থানে থিতু হওয়ার সুযোগ পায়। এতে পাউবোর দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে আসবে।
৩. গাইড ওয়াল ও ব্রেক-ওয়াটার: শঙ্খ নদীর তীব্র বাঁক ও সমুদ্রের ঢেউয়ের কারণে ড্রেজিংয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই পুনরায় ‘ব্যাক-ফিলিং’ বা পলি ভরাট হয়ে যায়। পাউবোকে এখানে আধুনিক ‘ব্রেক-ওয়াটার’ নির্মাণ করতে হবে, যা সমুদ্রের বালুর অনুপ্রবেশ ঠেকাবে।
মৎস্য অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ
নাব্যতা সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্থানীয় মৎস্যজীবীদের ওপর। বড় ফিশিং ট্রলারগুলো সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় মাঝসমুদ্রেই ছোট নৌকায় মাছ খালাস করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় সাগরে অবস্থান করায় মাছের গুণমান নষ্ট হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি মূল্য কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপকূলে প্রস্তাবিত ফিশ প্রসেসিং জোনগুলোতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
গত ৫ বছরে পাহাড় থেকে আসা পলির পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এই পলি জমার হার আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী ‘ত্রিমাত্রিক মডেলিং’ বা গাণিতিক সিমুলেশন ছাড়া কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন নদী প্রকৌশলীরা।
সুপারিশ ও সমাধান
এই ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠতে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
  • পাউবো ও বন বিভাগের যৌথ পরিচালনায় মোহনা এলাকায় একটি ‘সেডিমেন্ট ট্র্যাপ’ বা স্থায়ী পলি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন।
  • জেটি নির্মাণের আগে আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তায় পলির সম্ভাব্য গতিপথ নির্ধারণ।
  • বন বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা (ICM) বাস্তবায়ন।
শঙ্খ মোহনার এই সংকটকে বিজ্ঞানের আলোতে ও দুই দপ্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মোকাবিলা করা গেলে এটি বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com এবং আপনার মূল্যবান মতামত দিন।