Home Second Lead মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১০০ রুপির দোরগোড়ায় ভারতীয় মুদ্রা

মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১০০ রুপির দোরগোড়ায় ভারতীয় মুদ্রা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তেলের বাজারের ঊর্ধ্বগতির জেরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড পতনের মুখে পড়েছে ভারতীয় রুপি। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রা ব্যবসায়ীরা এখন বাজি ধরছেন—খুব শীঘ্রই প্রতি ডলারের মূল্য ১০০ রুপি স্পর্শ করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক সীমা পার হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতীয় রুপির মান প্রায় ৬ শতাংশ কমে গেছে। চলতি সপ্তাহে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) ব্যাপক হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও রুপির মান ডলারপ্রতি প্রায় ৯৭ রুপির কাছাকাছি নেমে আসে। এই পতনের পেছনে কাজ করছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চড়া দাম, ভারতের শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্রমাগত পুঁজি প্রত্যাহার, চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ভারত তার মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার ফলে তেলের দাম বাড়লেই দেশের মুদ্রা ও অভ্যন্তরীণ বাজার মূল্যের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি হয়।
প্রবাসীদের জন্য সাময়িক স্বস্তি, কিন্তু…
সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ (ইউএই) উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসরত লক্ষাধিক প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য রুপির এই অবমূল্যায়ন প্রাথমিকভাবে খুশির খবর নিয়ে এসেছে। যেহেতু ইউএই দিরহাম মার্কিন ডলারের সাথে নির্দিষ্ট হারে (১ ডলার = ৩.৬৭ দিরহাম) বাঁধা, তাই রুপির পতনে দিরহামের মানও রুপির বিপরীতে বাড়ছে। বর্তমানে ১ দিরহামের বিনিময় মূল্য প্রায় ২৭ রুপির কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং ডলার ১০০ রুপি পার হলে তা ২৮ রুপি ছুঁয়ে ফেলতে পারে।
এর ফলে প্রবাসীদের পাঠানো ৫,০০০ দিরহাম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রুপি হয়ে তাদের পরিবারের হাতে পৌঁছাচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই আনন্দ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। রুপির এই নজিরবিহীন পতনের কারণে ভারতে যদি আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, তবে তা সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি গ্রাস করবে। ফলে রেমিট্যান্সের বাড়তি টাকার সুবিধা তখন আর কাজে আসবে না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ ব্যাংকের জরুরি বৈঠক
মুদ্রা বাজারে প্যানিক বা আতঙ্ক ছড়ানো রোধ করতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। জানা গেছে, আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার নেতৃত্বে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রুপির পতন ঠেকাতে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন।
বাজার স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবেচনায় থাকা সম্ভাব্য বিকল্পগুলো হলো:
  • হুট করে সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া (Unscheduled Interest Rate Hike)
  • নতুন করে ডলার সোয়াপ নিলাম শুরু করা
  • সার্বভৌম ডলার বন্ড ইস্যু করা
  • প্রবাসী ভারতীয়দের (NRI) জন্য বিশেষ বৈদেশিক মুদ্রা আমানত প্রকল্প চালু করা, যা ভারত ২০১৩ সালের মুদ্রা সংকটের সময়েও সফলভাবে ব্যবহার করেছিল।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই ধরণের বিশেষ স্কিমের মাধ্যমে প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব, যা ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করবে। তবে কেবল এই হস্তক্ষেপ দিয়ে রুপির পতন থামানো যাবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
১৬তম অর্থ কমিশনের চেয়ারম্যান অরবিন্দ পানাগারিয়া প্রকাশ্যেই আরবিআই-কে পরামর্শ দিয়েছেন যেন তারা ‘১০০ রুপির’ এই মনস্তাত্ত্বিক সংখ্যাটি নিয়ে অতিরিক্ত আচ্ছন্ন না থাকে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কৃত্রিমভাবে মুদ্রার মান ধরে রাখতে গিয়ে রিজার্ভ খালি করার কোনো মানে হয় না, কারণ এতে মূল অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না। তার মতে, রুপির মানকে স্বাভাবিক নিয়মে কমতে দিলে তা ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে সাহায্য করতে পারে। তবে জ্বালানি তেলের এই সংকট যদি এক বছরের বেশি স্থায়ী হয়, তবে আগ্রাসীভাবে রুপি রক্ষা করার চেষ্টা ভারতের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠবে।
কেন বাড়ছে ঝুঁকি?
ভারতের জন্য বর্তমান সংকটটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সুদের হারের ব্যবধান অনেক কমে গেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতীয় বন্ড বা শেয়ারের আকর্ষণ আগের মতো থাকছে না। ইতিমধ্যেই বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ার বাজার থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি তুলে নিয়েছেন, যা গত বছরের রেকর্ড পরিমাণ তহবিল প্রত্যাহারের চেয়েও বেশি। এই পুঁজি পাচারের কারণে বাজারে ডলারের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে এবং রুপির ওপর চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।
পাশাপাশি, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ, খাদ্যপণ্য এবং উৎপাদন খাতের ব্যয় একযোগে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের বিপরীতে ১০০ রুপি পার হওয়া হয়তো একটি প্রতীকী সংখ্যা, কিন্তু আসল বিপদ লুকিয়ে আছে এর পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে—যা ভারতের বাজারে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি বাড়াবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমাবে এবং বৈদেশিক অর্থায়নের খরচ অনেক বাড়িয়ে দেবে।