বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সামষ্টিক অর্থনীতির নানা জটিল সমীকরণ আর হিসাব-নিকাশের বাইরে এই বাজেট নিয়ে সবচেয়ে বেশি উৎসুক দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে থাকা তৃণমূলের মানুষ কেমন বাজেট চান, তা জানতে কথা হয়েছে আনোয়ারার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে।
বারখাইন গ্রামের প্রবীণ কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমাদের জন্য বড় বাজেট মানে সারে ভর্তুকি আর সময়মতো সেচ সুবিধা পাওয়া। এখন সবকিছুর দাম বাড়তি। আমরা চাই বাজেটে যেন ধান, বীজ আর সারের দাম কমানোর সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকে, যাতে চাষাবাদ করে আমরা দুমুঠো খেয়ে বাঁচতে পারি।”
চাতরি চৌমুহনি এলাকার অটোরিকশাচালক ফাইজুল ইসলামের চোখে-মুখে দৈনিক উপার্জনের দুশ্চিন্তা। তিনি জানান, “সংসার চালাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা বড় বড় মেগা প্রকল্প বুঝি না, আমাদের দাবি একটাই— চাল, ডাল, তেল আর ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা হোক। বাজেটে যেন আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থার বরাদ্দ থাকে।”
ব্যবসায়িক মন্দা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান বটতলি রুস্তম হাটের মুদি দোকানি শরিয়ত উল্লাহ। তিনি বলেন, “পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম প্রতিদিন বাড়ছে, অথচ কাস্টমারের পকেটে টাকা নেই। বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। আমরা চাই এমন একটা বাজেট, যা বাজারের অস্থিরতা দূর করবে এবং ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা রাখবে।”
রান্নাঘরের টানাপোড়েন আর সংসারের বাজেট মেলাতে হিমশিম খাওয়া গৃহিণী আফিয়া ফারজানা ক্ষোভ ও প্রত্যাশা নিয়ে বলেন, “সংসার চালাতে গিয়ে এখন আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে। প্রতি মাসে সিলিন্ডার গ্যাস আর বিদ্যুতের বিল দিতেই আয়ের বড় অংশ চলে যায়। সরকার বড় বড় খাতের হিসাব করলেও আমাদের মতো সাধারণ গৃহিণীদের কষ্টটা বোঝে না। নতুন বাজেটে সিলিন্ডার গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষের মাসের খরচ কিছুটা হলেও কমে।”
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্তের সংকট নিয়ে কথা বলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিলকিস আকতার। তিনি উল্লেখ করেন, “বর্তমান বাজারে স্থায়ী বেতনের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো দরকার, যাতে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো একটু স্বস্তিতে নিশ্বাস নিতে পারে।”
আনোয়ারা কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী ফাহিম ফিরদৌস তরুণ প্রজন্মের চাকুরির বাজার ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর জোর দেন। তার মতে, “উচ্চশিক্ষা শেষ করে তরুণরা যেন বেকার বসে না থাকে, সেজন্য বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশেষ কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। ল্যাপটপ, ইন্টারনেট এবং শিক্ষাসামগ্রীর ওপর শুল্ক কমিয়ে তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতের নাগালে আনা দরকার।”
উপজেলা সদরের একটি সরকারি অফিসের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী অনিল নাথ তার সীমাবদ্ধ আয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, “বেতন যেটুকু পাই, তা দিয়ে মাসের ১৫ দিন চলাই দায়। চিকিৎসা আর সন্তানদের পড়ালেখার খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে। নতুন বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য মহার্ঘ ভাতা বা বেতন স্কেল পুনর্বিন্যাসের ঘোষণা আমাদের বড় প্রত্যাশা।”
একই অফিসের পিয়ন আবদুর রহিম জানান তার কষ্টের কথা। তিনি বলেন, “সবকিছুর দাম ডাবল হয়েছে কিন্তু আমাদের আয় বাড়েনি। সরকার যদি বাজেটে স্বল্পমূল্যে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ওএমএস কার্যক্রম আরও জোরদার করে, তবে আমাদের মতো সাধারণ কর্মচারীদের অনেক উপকার হবে।”
সড়কের পাশে ছোট্ট চৌকিতে ব্যবসা করা ফুটপাতের হকার হায়বত আলী বলেন, “পুলিশ আর উচ্ছেদের ভয়ে সবসময় থাকতে হয়। আমরা তো দেশের অর্থনীতিতেই অবদান রাখছি। বাজেটে আমাদের মতো ক্ষুদ্র হকারদের পুনর্বাসন এবং সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণের জন্য কোনো তহবিল রাখা হলে আমরা পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারতাম।”
এছাড়াও এলাকার দিনমজুর ও স্থানীয় যুবসমাজের অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের বাজেট ভাবনা এখন মূলত ‘জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ’ কেন্দ্রিক। বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষের পকেটের অবস্থা এবং দৈনন্দিন পুষ্টি ও চিকিৎসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক আগামী বাজেটের মূল লক্ষ্য— এটাই তৃণমূলের আপামর জনতার একমাত্র প্রত্যাশা।