Home পরিবেশ পাহাড়ে বিপন্ন বন্যপ্রাণী: রাঙামাটি বান্দরবানে বাড়ছে নৃশংসতা

পাহাড়ে বিপন্ন বন্যপ্রাণী: রাঙামাটি বান্দরবানে বাড়ছে নৃশংসতা

রাঙামাটির লংগদুতে স্থানীয়দের নির্মমতার শিকার ৬০ বছরের হাতিটি। ছবি: সমির মল্লিক।
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: পরিবেশবাদী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থা ‘মঙ্গাবে’ (Mongabay)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে এশীয় হাতির চরম সংকটময় জীবনযাত্রার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর লাল তালিকাভুক্ত এই বিপন্ন প্রাণীর সংখ্যা দেশে আশঙ্কাজনক হারে কমছে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্থায়ী আবাসিক বন্য হাতির সংখ্যা মাত্র ২০০ থেকে ২৫০টির মতো। অথচ ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে গত কয়েক বছরেই মানুষের সঙ্গে সংঘাতসহ বিভিন্ন কারণে অন্তত ১৫১টি হাতির মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অচিরেই এ দেশ থেকে হাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘মঙ্গাবে’-এর প্রতিবেদনে হাতি মৃত্যুর পেছনে প্রধানত কয়েকটি নির্মম কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, ফসলি জমি বা লোকালয়ের চারপাশে পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা অবৈধভাবে উচ্চ ভোল্টেজের জিআই তারের বৈদ্যুতিক বেড়া দিয়ে রাখে। এই বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত হাতির প্রাণ যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসা হাতির ওপর উত্তেজিত জনতা সরাসরি গুলি ছুড়ছে কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করছে। এমনকি ফসলের ক্ষতি এড়াতে বা প্রতিশোধ নিতে হাতির যাতায়াতের পথে খাবারে বিষ মিশিয়ে রাখার মতো ঘটনাও ঘটছে। এর বাইরে বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইনে রাতের অন্ধকারে দ্রুতগামী ট্রেনের ধাক্কায় প্রায়ই প্রাণ হারাচ্ছে এই বিশাল প্রাণীটি।
সম্প্রতি রাঙামাটির লংগদু এবং বান্দরবানের পার্বত্য বনাঞ্চলে হাতির মৃত্যু ও নির্মম নির্যাতনের ঘটনাগুলো বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় চরম অবহেলা এবং স্থানীয় সচেতনতার অভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এসব এলাকায় বন কেটে জুম চাষ, তামাক চাষ ও অবৈধ বসতি স্থাপন দিন দিন বাড়ছে। যখনই কোনো হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করছে, তখনই তাকে তাড়াতে পটকা ফোটানো, গায়ে আগুন দেওয়া কিংবা ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করার মতো নৃশংস পদ্ধতি বেছে নেওয়া হচ্ছে।
বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ে অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং বন্যপ্রাণী আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণীর গুরুত্ব যে কতটা অপরিসীম, সেই মৌলিক সচেতনতা পার্বত্য অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও গড়ে ওঠেনি।
এই সংকটের মূল উৎস আসলে হাতির বাসস্থান ও তীব্র খাদ্য সংকট। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পাহাড় কাটা এবং নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে হাতিদের আদি বিচরণক্ষেত্র ও প্রাচীন করিডোরগুলো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে। এক বন থেকে অন্য বনে যাতায়াতের পথ হারিয়ে ক্ষুধার্ত হাতির দল বাধ্য হয়ে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিতে হানা দিচ্ছে। আর তখনই মানুষ ও হাতির মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ।
businesstoday24.com ফলো করুন।