Home First Lead ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালী পার হয়ে ফুজাইরায়

‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালী পার হয়ে ফুজাইরায়

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম:মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পড়ে দীর্ঘ সাড়ে চার মাস অবরুদ্ধ থাকার পর অবশেষে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সফলভাবে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।

বাংলার জয়যাত্রার নাবিকবৃন্দ। ছবি সংগৃৃৃৃৃৃহীত

 ২৩ জুন মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টার দিকে জাহাজটি এই জলসীমা পার হয় এবং  বিকেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের আউটার অ্যাঙ্করেজে (বহির্নোঙ্গর) গিয়ে পৌঁছায়। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। এ খবরে ভুক্তভোগী নাবিকদের পরিবার ও বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতে দীর্ঘ উৎকণ্ঠা শেষে স্বস্তি নেমে এসেছে। ফুজাইরাহ বন্দরে এখন জাহাজটির নিরাপদ বাংকারিং এবং তলদেশ পরিষ্কারসহ (বটম-ক্লিনিং) প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮,৮৯৪ টন ডেডওয়েট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বাল্ক ক্যারিয়ারটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি ক্রু বা নাবিক রয়েছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও চরম যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তার মাঝেও সীমাহীন সাহসিকতা ও সুনিপুণ নৌ-কৌশল প্রদর্শন করে তারা সবাই সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি খ্যাতনামা চার্টারের অধীনে গত ২৬ জানুয়ারি জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। প্রাথমিকভাবে জাহাজটি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৯,০০০ টন স্টিল কয়েল বোঝাই করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে নিয়ে আসে। তবে জাহাজটি জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে তীব্র আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর কারণে জাহাজের কার্গো খালাস প্রক্রিয়া চরম হুমকির মুখে পড়লেও, সেই তীব্র প্রতিকূলতা ও যুদ্ধজনিত ঝুঁকির মাঝেই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে স্টিল কয়েল কার্গো সফলভাবে খালাস করা হয়।

কার্গো খালাস হওয়ার পর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটির পক্ষে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় জাহাজটি যেন অলস বসে না থাকে এবং চার্টারারের ‘হায়ার’ বা দৈনিক ভাড়া প্রাপ্তি যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়—সেই দূরদর্শী বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিএসসি ম্যানেজমেন্ট। সেই নতুন বাণিজ্যিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাহাজটিকে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে প্রায় ৩৭,০০০ মেট্রিক টন সার বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন ও ডারবান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা করানো হয়। সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও বিএসসি ম্যানেজমেন্টের দক্ষ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার কারণে নতুন কার্গো বোঝাই করার জন্য জাহাজটি একদিনের জন্যও ‘অফ-হায়ার’ হয়নি, অর্থাৎ জাহাজের নিয়মিত ভাড়ার পরিমাণ অব্যাহত ছিল এবং রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার কোনো চার্টার আয় লোকসান হয়নি।

কিন্তু সার বোঝাই করার পর হরমুজ প্রণালীর তীব্র অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি আর সেখান থেকে বের হতে পারেনি। দীর্ঘ অচলাবস্থার একপর্যায়ে, গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজটির ট্রানজিট বা পারাপারের অনুমতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই স্পর্শকাতর যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘসময় অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অপেক্ষা করতে থাকে বিএসসির এই বাণিজ্যিক জাহাজটি।

চলতি বছরের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ ‘চোক-পয়েন্টে’ পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ-ঝুঁকিবিমা প্রিমিয়ামের রেকর্ড ঊর্ধ্বগতি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত হওয়ার এই জটিল বাস্তবতায়, সরকারের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সফলতায় ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র এই নিরাপদ ট্রানজিট জাতীয় মেরিটাইম খাতের সক্ষমতার এক ঐতিহাসিক জয়।

বিএসসির ইতিহাসে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন ক্রাইসিস মোকাবিলার নজির যেমন বিরল, তেমনই তা বিশ্ব মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।

দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার এই সংকটকালীন পুরো সময়জুড়ে জাহাজের ৩১ বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুদের মনোবল সমুন্নত রাখতে বিএসসি ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল নানা পদক্ষেপ। জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানি তেলের মতো প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস সরবরাহে কখনোই কোনো ঘাটতি হতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধাদির অতিরিক্ত হিসেবে বিশেষ অনুমোদন সাপেক্ষে দৈনিক ৫ মার্কিন ডলার বিশেষ মিল অ্যালাউন্স, ঈদের বিশেষ প্রণোদনা এবং ‘ওয়ার ওয়েজ’ দেওয়া হয়েছে। ম্যানেজমেন্টের এমন আন্তরিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত চরম প্রতিকূলতার মাঝেও নাবিকদের নির্ভীকভাবে দায়িত্ব পালনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

সরকার, মন্ত্রণালয় ও বিএসসি ম্যানেজমেন্টের যৌথ অ্যাকশন প্ল্যান ও তদারকি এই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

বিএসসির এমডি কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই জাতীয় সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিষয়টির ওপর সার্বক্ষণিক নিবিড় নজরদারি রেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া ভিডিও কনফারেন্স ও ফোনালাপের মাধ্যমে জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন এবং তাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে জাহাজটি যখন হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমা অতিক্রম করছিল, তখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিএসসির টপ ম্যানেজমেন্ট মেরিন ট্রাফিকের মাধ্যমে সার্বক্ষণিকভাবে জাহাজের প্রতি মুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং লাইভ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

সরকার ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান, বিএসসি ম্যানেজমেন্টের দূরদর্শী ক্রাইসিস হ্যান্ডলিং এবং জাহাজের বীর ক্যাপ্টেন ও চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ সব ক্রুদের ঐকান্তিক ও অসম সাহসিকতার যৌথ সমন্বয়েই এই বড় ধরনের দুর্যোগ বা ক্রাইসিস সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।