চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম শহর কেবল পাহাড় আর সমুদ্রের মেলবন্ধন নয়, এ এক চেনা স্বাদের নগরী। ভোর হওয়ার আগেই যেখানে মশলার সুবাসে চারপাশ মেতে ওঠে। চট্টলার খাবারের রাজকীয় গল্পে মেজবানি মাংসের কথা সবাই জানে, তবে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভোজনরসিকদের মনে যার স্থান একদম আলাদা, তা হলো—নলার ঝোল ও গরম বুটের ডাল।
ভোরের কুয়াশা মেখে কিংবা দুপুরের কড়া রোদে যখন প্লেটে ধোঁয়া ওঠা লালচে নলার ঝোল আর তার সাথে ঘন তুলতুলে বুটের ডাল এসে পড়ে, তখন প্রথম গ্রাসেই মন হারিয়ে যায় চট্টগ্রামের শতাব্দী প্রাচীন খাদ্যসংস্কৃতিতে।
গরুর পায়ের হাড়, নলী বা নেহারির ভেতরের সুস্বাদু মজ্জা (মগজ বা নলা) দীর্ঘ সময় কম আঁচে কষিয়ে রান্না করা হয়। আর সেই ঝোলের সাথেই যোগ দেওয়া হয় ছোলার ডাল বা বুটের ডাল। মশলার পরতে পরতে থাকে তেজপাতা, এলাচ, দারুচিনি, আর চট্টগ্রামের খাস লাল মরিচের ঝাঁঝ। হাড়ের ভেতর থেকে মাখনের মতো বের হয়ে আসা মজ্জা আর ডালের মাখামাখি স্বাদ মুখে এক অপার্থিব তৃপ্তি এনে দেয়।
চট্টগ্রামের এই কালজয়ী খাবারের কারিগরদের কাজ বোঝার জন্য কথা হয়েছিল নগরীর চকবাজারের এক পুরনো হোটেলের প্রবীণ বাবুর্চি রফিক মিয়ার সাথে। তিন দশক ধরে তিনি সকালে শহরের মানুষকে খাওয়াচ্ছেন এই ঐতিহ্যবাহী নলার ঝোল।
নলার ঝোলের মূল রহস্য জানতে চাইলে রফিক মিয়া মৃদু হেসে বলেন, “পুঁথিগত রেসিপি দিয়ে এই রান্না হয় না বাজি। মূল খেলাটা হলো ধৈর্যের। আমরা আগের দিন রাত থেকেই হাঁড়িতে নলা আর মশলা বসিয়ে দিই। সারারাত কম আঁচে ফুটতে ফুটতে হাড়ের ভেতরের নির্যাস ঝোলের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। সকালে যখন বুটের ডাল দেওয়া হয়, তখন সেই ঘন ঝোল পুরো ডালের ভেতরে ঢুকে যায়। অনেকে মনে করে ডাল আলাদা রান্না করে নলার ঝোলের সাথে মেশালে বুঝি একই স্বাদ হবে, কিন্তু আসল গোপন কথা হলো দুটোকে একসাথে মিশে সিদ্ধ হতে দিতে হয়।”
খাবারের টেবিলে বসে তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছিলেন চাকরিজীবী তানভীর আহমেদ। চামচ দিয়ে নলা থেকে মজ্জা বের করতে করতে তিনি জানান তাঁর অভিজ্ঞতার কথা।
তানভীর বলেন, “আমি কাজের সূত্রে দেশের অনেক জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু চট্টগ্রামের এই বুটের ডাল দিয়ে নলার ঝোলের স্বাদ অন্য কোথাও মেলেনি। সকালে গরম ভাতের সাথে এই ঝোলের যে গভীরতা আর মজ্জার মাখনের মতো টেক্সচার, তা দিয়ে এক প্লেট ভাত নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। এটা শুধু একটা খাবার না, আমাদের চট্টগ্রামবাসীর কাছে এটি একধরনের আবেগ।”
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানে গেলে দেখা যায় এক চমৎকার দৃশ্য। রিকশাচালক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে করপোরেট কর্মকর্তা—সবাই এক টেবিলে পাশাপাশি বসে গভীর মনযোগে এই নলার ঝোল ও বুটের ডালে ডুব দিচ্ছেন।
খাদ্য রসিকদের মতে, ভালো রান্নার সবচেয়ে বড় গুণ হলো তা মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। চট্টগ্রামের নলার ঝোল আর বুটের ডাল ঠিক সেই কাজটাই করে আসছে যুগে যুগে। আধুনিক ফাস্টফুডের যুগেও এই ঐতিহ্যবাহী ডাল-নলার ঝোল তার নিজের স্থান ধরে রেখেছে সগৌরবে।