বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম মেরিটাইম হাব সিঙ্গাপুর বন্দরে জাহাজের অতিরিক্ত চাপ এবং তীব্র কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিপিং ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিঙ্গাপুর বন্দরে ‘হাই কনজেশন’ বা তীব্র জট পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রবিবার দুই ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী সেখানে সক্রিয় জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,১৪৬টিতে। এর মধ্যে ১,১৭৮টি জাহাজ বর্তমানে নোঙর করে অপেক্ষমাণ রয়েছে। সাধারণত আউটার রোডসে নোঙরে থাকে ৩০০ থেকে ৫০০ জাহাজ । বন্দরের মোট ২০০টি বার্থের মধ্যে ১৫৭টিতে জাহাজ বাঁধা। বার্থ অকুপেন্সি দাঁড়িয়েছে ৭৯ শতাংশে।
জাহাজভেদে এই অপেক্ষার সময় ও বিলম্বের চিত্রে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। কনটেইনার জাহাজগুলোকে নোঙর থেকে বার্থে ভেড়ার আগে সাধারণত ১২ থেকে ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বাল্ক ক্যারিয়ারগুলো সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নোঙরে অবস্থান করছে, যার গড় অপেক্ষার সময় ২ থেকে ৪ দিন।
অন্যদিকে, ট্যাংকারগুলো জেটিতে ভেড়ার চেয়ে অনেকেই ওয়েস্টার্ন অ্যাংকরেজে শিপ-টু-শিপ (এসটিএস) ট্রান্সফার পরিচালনা করছে, যাতে সমন্বয়ের ওপর ভিত্তি করে ৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে।
চট্টগ্রামে শিপিং সার্কেলের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বন্দরে জট তৈরি ও বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি মূল কারণ কাজ করছে। ট্রান্স-প্যাসিফিক এবং এশিয়া-ইউরোপ রুটের শিডিউলের কারণে প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও মঙ্গলবারে জাহাজ আগমনের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে, ফলে এই দিনগুলোতে পৌঁছানো জাহাজগুলোকে বেশি সময় নোঙরে থাকতে হচ্ছে। পাশাপাশি টুয়াস মেগাপোর্ট নির্মাণাধীন থাকায় টার্মিনালগুলোর স্থানান্তরের কাজ চলায় তা সাময়িক ধারণক্ষমতায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
এছাড়া ওয়েস্টার্ন অ্যাংকরেজে ট্যাংকারগুলোর দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার এলাকা দখল করে রাখায় নতুন আগত জাহাজের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট মৌসুমে সাগর উত্তাল থাকলে এসব কার্যক্রমের গতি ধীর হয়ে যায়।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে যে প্রভাব পড়ছে
বৈশ্বিক এই বন্দর জটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর, পোর্ট ক্লাং কিংবা কলম্বোর মতো ট্রান্সশিপমেন্ট হাবের মাধ্যমে।
১. লিড টাইম ও ট্রানজিট বিলম্ব: সিঙ্গাপুর বন্দরে ফিডার ভেসেল থেকে মাদার ভেসেলে কনটেইনার স্থানান্তরে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। তৈরি পোশাকসহ (আরএমজি) বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য সময়মতো ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে পৌঁছানো নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত লিড টাইমে পণ্য ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের ডিসকাউন্ট বা আকাশপথে ব্যয়বহুল এয়ার ফ্রেইটের ঝুঁকি নিতে হতে পারে।
২. কাঁচামাল আমদানিতে ধীরগতি: তৈরি পোশাক ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, বিশেষ করে সুতা, কাপড়, রাসায়নিক ও মূলধনী যন্ত্রপাতি মূলত সিঙ্গাপুর ও আশপাশের হাব হয়ে বাংলাদেশে আসে। সেখানে কনটেইনার আটকে থাকায় দেশের শিল্প কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করে দিচ্ছে।
৩. কনটেইনার ও জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি: ট্রান্সশিপমেন্ট জটের কারণে বৈশ্বিক লজিস্টিকসে খালি কনটেইনারের সংকট তীব্র হচ্ছে। জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অপেক্ষমাণ সময়ের ব্যয়ভার মেটাতে সারচার্জ ও কনটেইনার ফ্রেইট রেট বাড়িয়ে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক উভয়ের জন্যই পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের এই জটিল পরিস্থিতিতে বিকল্প বন্দর হিসেবে কলম্বো বা পোর্ট ক্লাংয়ের কার্যকর ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থানীয় টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমিয়ে আনতে দ্রুত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক লজিস্টিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।