বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: সব শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং দেশের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত দেড় দশক দেশের অর্থনীতি ছিল মূলত নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর সুবিধা দেওয়ার পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। সেই ধারা থেকে বের হয়ে এসে এবারের বাজেটে সমাজের কোনো শ্রেণী, পেশা, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে বাইরে রাখা হয়নি। সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রতিটি মানুষকে এই বাজেটের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং উন্নয়নের মূলধারার বাইরে থাকা মানুষদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা। জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর নির্বাচিত নতুন সরকারের এই বাজেটটি জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বর্তমান সরকারের চ্যালেঞ্জ অনেক বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অপচয় রোধ করে নীতি-নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এখন থেকে সরকারি প্রতিটি প্রকল্প ও ব্যয় প্রধানত চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে: অর্থের যথাযথ ব্যবহার (ভ্যালু ফর মানি), বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট), কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা।
অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, সেবা নিতে গিয়ে কেউ হয়রানির শিকার হলে সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালু করা হবে এবং নীতিমালা বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কার্যালয়ে বিশেষ ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে। সরকারের এই পরিকল্পনাগুলোর ৮০ শতাংশ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে পূর্ববর্তী লুটপাটের কারণে তৈরি হওয়া মূলধন ঘাটতিও এর অন্যতম কারণ। তবে র্যাব বা পুলিশ দিয়ে নয়, বরং সঠিক নীতি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং সরকারের নীতিগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়িত হলে ইনফ্লেশন কন্ট্রোল করা কঠিন হবে না।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আগামী ১লা জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল চালুর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়বে, যা তাদের দুর্নীতির প্রবণতা কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষ কর্মী তৈরিতে সরকার স্কিল ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত নানা প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বলেও তিনি জানান। কালোটাকা রোধে সারা দেশে মৌজাভিত্তিক জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে জমির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের কাজ চলছে, যার ফলে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে। এছাড়া অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস তৈরিতে সংস্কৃতিকে সম্পৃক্ত করে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াসিন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।