মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস মানেই ক্ষমতার লড়াই, বিশাল সব দুর্গ, ময়ূর সিংহাসন আর তাজমহলের মতো স্থাপত্যের গল্প। কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে কিছু চরম নির্মমতা আর ট্র্যাজেডির আখ্যান। মুঘল আমলের এমনই এক বিশ্বখ্যাত ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়ে পাকিস্তানের লাহোরে আজও দাঁড়িয়ে আছে একটি সৌধ। এটি আর কারও নয়, মুঘল যুবরাজ সেলিমের (পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর) প্রেমিকা ‘আনারকলি’র সমাধি। চার দেয়ালের মাঝে জীবন্ত ইটের প্রাচীরে গেঁথে দেওয়া এক নারীর করুণ মৃত্যুর ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই সৌধের দেয়ালে।
কে ছিলেন এই আনারকলি?
ইতিহাসবিদদের একাংশ এবং লোকগাথা অনুযায়ী, আনারকলির আসল নাম ছিল শরিফুন্নিসা (কারও মতে নাদিরা বেগম)। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত রূপবতী এবং পারদর্শী নৃত্যশিল্পী। মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে তাঁর নাচ এবং রূপের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। কথিত আছে, তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট আকবর নিজেই তাঁকে ‘আনারকলি’ (ডালিমের কলি) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং তাঁকে রাজদরবারের প্রধান নৃত্যশিল্পী বা উপপত্নীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
নিষিদ্ধ প্রেম
ট্র্যাজেডির শুরু হয় তখন, যখন সম্রাট আকবরের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মুঘল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী শাহজাদা সেলিম আনারকলির প্রেমে পড়েন। রাজপ্রাসাদের কঠোর নিয়মের তোয়াক্কা না করে তাঁদের মধ্যকার এই সম্পর্ক গভীর অনুরাগে রূপ নেয়। কিন্তু এক সাধারণ দাসী বা নৃত্যশিল্পীর সাথে মুঘল সাম্রাজ্যের হবু সম্রাটের এই প্রেমকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না সম্রাট আকবর।
আকবরের কাছে এটি কেবল একটি সাধারণ প্রেমের সম্পর্ক ছিল না, বরং মুঘল রাজবংশের মর্যাদা এবং সিংহাসনের নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি ছিল। তিনি সেলিমকে বারবার এই সম্পর্ক থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন। কিন্তু প্রেমের টানে অন্ধ শাহজাদা সেলিম পিতার আদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
‘জীবন্ত সমাধি’র সেই নির্মম রাত
যুবরাজ সেলিমের এই বিদ্রোহ সম্রাট আকবরকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ১৫৯৯ সালের দিকে, সেলিম যখন কোনো এক রাষ্ট্রীয় কাজে বা সামরিক অভিযানে লাহোরের বাইরে ছিলেন, তখন সম্রাট আকবর আনারকলিকে বন্দি করার নির্দেশ দেন। সম্রাট সিদ্ধান্ত নেন, এই প্রেমের এমন এক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে যা পুরো সাম্রাজ্য মনে রাখবে।
শাস্তি হিসেবে আনারকলির জন্য কোনো ফাঁসি বা তরবারির আঘাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং লাহোর দুর্গের একটি অংশে তাঁকে সোজা দাঁড় করিয়ে চারপাশ থেকে ইটের দেয়াল তুলতে শুরু করা হয়। লোককাহিনী ও থিয়েটারের বর্ণনামতে, ইটের পর ইট যখন ওপরে উঠছিল, তখনো আনারকলির চোখে ছিল সেলিমের জন্য ভালোবাসা আর আকুলতা। একসময় শেষ ইটটি বসিয়ে চারপাশের দেয়াল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেয়ালের ভেতরের সেই সামান্য অন্ধকার জায়গাটুকুতে অক্সিজেনের অভাবে ধীরে ধীরে দমবন্ধ হয়ে জীবন্ত সমাধি ঘটে এক রূপবতী নারীর।
প্রেমিকের কান্না এবং লাহোরের সেই সমাধি সৌধ
পরবর্তীতে ১৬০৫ সালে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর শাহজাদা সেলিম ‘সম্রাট জাহাঙ্গীর’ হিসেবে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে বসেই তিনি তাঁর প্রিয়তমার সেই নির্মম মৃত্যুর স্থানে যান। ১৬১৫ সালে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে আনারকলির সেই জীবন্ত সমাধির ওপর নির্মাণ করা হয় একটি বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন সমাধি সৌধ, যা আজ ‘আনারকলির মাজার’ নামে পরিচিত।
এই সমাধির ভেতরে থাকা শ্বেতপাথরের তৈরি কফিনের গায়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর ফার্সি ভাষায় নিজের হৃদয়ের সমস্ত আকুতি আর কষ্ট লিখে রেখেছিলেন। যার অর্থ দাঁড়ায়: “আমি যদি আরও একবার আমার প্রিয়তমার মুখটি দেখতে পেতাম, তবে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত আমি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতাম।”
আনারকলির অস্তিত্ব নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে; অনেকে একে কেবলই লাহোরের লোকগাথা বা গল্প বলে মনে করেন। তবে সত্য বা রূপকথা— যা-ই হোক না কেন, লাহোরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমাধি সৌধটি আজও বিশ্ববাসীর কাছে নিষিদ্ধ প্রেমের এক নির্মম ও অমর প্রতীক।
নিয়মিত এমন বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক ও তথ্যসমৃদ্ধ ফিচার প্রতিবেদন পড়তে এবং আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে Visit www.businesstoday24.com।