Home চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের ভোটের লড়াইয়ে নতুন মোড়: আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা কি টিকবে?

সীতাকুণ্ডের ভোটের লড়াইয়ে নতুন মোড়: আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা কি টিকবে?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেছে ব্যাংক এশিয়া ও ট্রাস্ট ব্যাংক। একইসঙ্গে তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে পৃথক আপিল করেছেন ওই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী।

রোববার নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ইসি সূত্রমতে, ব্যাংক এশিয়া ও ট্রাস্ট ব্যাংক আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে এই আবেদন জমা দিয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এই আপিলগুলোর ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রিটার্নিং কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই শেষে আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্রটি বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ সামনে আসে। জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী দাবি করেন, উচ্চ আদালতের এক আদেশে আসলাম চৌধুরীকে ঋণখেলাপি ঘোষণা থেকে বিরত রাখার শর্ত হিসেবে ১৩টি ব্যাংকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ৫০ কোটি টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই শর্ত পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও মনোনয়ন বহাল রাখা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, আসলাম চৌধুরী এসব অভিযোগকে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি দাবি করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র নিয়ে এই আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক নির্দেশ করে:
১. ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও খেলাপি ঋণের প্রভাব
ব্যাংক এশিয়া ও ট্রাস্ট ব্যাংকের মতো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যখন কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপিল করে, তখন তা মূলত তাদের পাওনা আদায়ের একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে। বৃহৎ অঙ্কের ঋণ যখন অনাদায়ী থাকে, তখন ব্যাংকের তারল্য সংকট (Liquidity Crisis) তৈরি হয় এবং সাধারণ আমানতকারীদের ঝুঁকি বাড়ে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ পরিশোধ না করার সংস্কৃতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
২. আইনি শর্ত ও আর্থিক দায়বদ্ধতা
জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—আদালতের দেওয়া শর্ত (৫০ কোটি টাকা জমা দেওয়া)। অর্থনীতিতে একে ‘Conditional Stay’ বলা হয়। আসলাম চৌধুরী যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ জমা দিতে ব্যর্থ হন, তবে তা আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এটি প্রমাণ করে যে, অনেক ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ঋণখেলাপি তকমা এড়ানো হলেও প্রকৃত অর্থে ব্যাংকের দেনা পরিশোধিত হয় না।
৩. নির্বাচনে ‘অসৎ অর্থের’ (Dirty Money) প্রভাব
নির্বাচনী আইনে ঋণখেলাপিদের অযোগ্য ঘোষণা করার মূল উদ্দেশ্য হলো আর্থিক অপরাধীদের আইনসভা থেকে দূরে রাখা। যদি ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং জয়ী হন, তবে তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গিয়ে নিজেদের ঋণের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, যা অর্থনীতির জন্য ‘Systemic Risk’ তৈরি করে।
৪. বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকের আস্থা
জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বড় মাপের খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের এই অবস্থান বিনিয়োগকারীদের মাঝে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয় যে, ব্যাংকগুলো তাদের পাওনা আদায়ে সক্রিয়। তবে যদি রাজনৈতিক কারণে এই আপিলগুলো অগ্রাহ্য হয়, তবে সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা আরও কমতে পারে। আসলাম চৌধুরীর এই মামলাটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা (Financial Discipline) এবং নির্বাচনী নৈতিকতার (Electoral Ethics) একটি বড় পরীক্ষা। কমিশনের শুনানি থেকে বোঝা যাবে আইনগত ও অর্থনৈতিক মানদণ্ডে তাঁর প্রার্থিতা কতটা গ্রহণযোগ্য।