Home Second Lead বিশ্বজুড়ে সিমেন্ট শিল্পে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ: কোন পথে বাংলাদেশ?

বিশ্বজুড়ে সিমেন্ট শিল্পে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ: কোন পথে বাংলাদেশ?

আমিরুল মোমেনিন
ঢাকা: বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশের জন্য দায়ী সিমেন্ট শিল্প। এর পাশাপাশি ধূলিকণা (Particulate Matter), সালফার ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো মারাত্মক বায়ুদূষক নির্গমনের কারণে এই শিল্পের ওপর বিশ্বজুড়ে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম’ (CBAM) থেকে শুরু করে প্রতিবেশী ভারতে কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তির বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে সিমেন্ট খাতে চলছে এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন।
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এখন সিমেন্ট কারখানার চিমনিতে ‘কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেম’ (CEMS) বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরাসরি কারখানার লাইভ দূষণের তথ্য দেখতে পায়। বৈশ্বিক এই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উদীয়মান সিমেন্ট শিল্পের পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ রূপান্তরের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
দেশীয় শিল্পের পরিধি ও পরিবেশগত অবস্থান
বাংলাদেশে আবাসন ও অবকাঠামো খাতের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সিমেন্ট শিল্পেরও অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বর্তমানে দেশে ৩০টিরও বেশি সক্রিয় সিমেন্ট কারখানা রয়েছে, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি। তবে এই বিপুল উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারেনি।
দেশের অধিকাংশ আধুনিক কারখানায় উন্নত ‘ব্যাগ ফিল্টার’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধূলিকণা ছড়ানো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও, সামগ্রিক গ্যাস নির্গমন এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এবং দূরদর্শী নীতিমালার অভাব রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
১. ক্লিংকার আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা:
সিমেন্ট উৎপাদনের মূল উপাদান হলো ক্লিংকার, যা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি কার্বন ও গ্যাস নিঃসৃত হয়। বাংলাদেশ মূলত ক্লিংকার আমদানি করে এখানে শুধু গ্রাইন্ডিং (পেষণ) ও মিক্সিং করে। আপাতদৃষ্টিতে মূল দূষণকারী প্রক্রিয়াটি দেশের বাইরে ঘটলেও, আমদানিকৃত এই উপাদানের ওপর বৈশ্বিক ‘কার্বন ট্যাক্স’ বা শুল্কের প্রভাব পরোক্ষভাবে দেশীয় বাজারের ওপর পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া দেশের ভেতরে পেষণ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের সময় বিপুল পরিমাণ ধূলিকণা ছড়ায়।
২. লাইভ মনিটরিং বা CEMS-এর অনুপস্থিতি:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিমনি থেকে নির্গত দূষণের লাইভ ডাটা সিসিটিভি বা বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা হলেও, বাংলাদেশে পরিবেশ অধিদপ্তর এখনো সব কারখানায় এই ‘রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম’ (CEMS) বাধ্যতামূলক বা পুরোপুরি কার্যকর করতে পারেনি। ফলে কারখানাগুলো পরিবেশের মানদণ্ড কতটা মেনে চলছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. বিকল্প কাঁচামালের আইনি ও ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা:
কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিশ্বে এখন ক্লিংকারের ব্যবহার কমিয়ে ফ্লাই অ্যাশ, স্লাগ বা ক্যালসাইন্ড ক্লে-র মতো পরিবেশবান্ধব উপাদানের মিশ্রণ বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশের কারখানাগুলো ওআইসি বা ব্লেন্ডেড সিমেন্ট তৈরি করলেও সরকারি ও বেসরকারি বড় অবকাঠামো নির্মাণে এখনো শতভাগ পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পরিবেশবান্ধব ব্লেন্ডেড সিমেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের নীতিগত প্রচার ও সচেতনতার অভাব রয়েছে।
প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং স্থানীয় বায়ুদূষণ রোধে বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে:
  • দেশের প্রতিটি সিমেন্ট কারখানায় ‘কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেম’ (CEMS) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে এর লাইভ সংযোগ নিশ্চিত করা।
  • সরকারি নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে পরিবেশবান্ধব বা কম কার্বনযুক্ত সিমেন্ট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা।
  • কারখানায় বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া।
বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পকে টেকসই এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতাসক্ষম রাখতে হলে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা নীতিমালার আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক নিয়মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই খাত বড় ধরনের আইনি ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
Visit www.businesstoday24.com